‘ছয় দিন আগে নিজের কবরের স্থান দেখিয়ে দেন আইয়ুব বাচ্চু’

আজকের নারায়নগঞ্জ ডেস্কঃ  আইয়ুব বাচ্চু তাঁর- বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের কিংবদন্তি গিটার বাদক ও সঙ্গীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু শনিবার প্রিয় শহর চট্টগ্রামে এসেছেন কোন মঞ্চে গান করতে নয়, এবার প্রিয় শহরে এসেছেন মায়ের কাছে থাকতে। তবে একদিন কিংবা দুদিনের জন্য নয়, অনন্তকাল ধরে থাকবেন মায়ের পাশে।

গত বৃহস্পতিবার না ফেরার দেশে চলে যাওয়া এই কিংবদন্তি শিল্পীকে মায়ের কবরের পাশে চিরসমাহিত করার জন্য শনিবার সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে বেসরকারি একটি বিমানে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হয়। এরপর কফিনে বন্দী শিল্পীর নিথর দেহ আনা হয় নগরের সদরঘাট থানার পূর্ব মাদারবাড়ি তার নানার বাড়িতে। এখানে শৈশব কৈশোর কেটেছে কিংবদন্তি এ শিল্পীর। নানার বাড়িতে কিছুক্ষণ রাখার পর শেষবারের মতো দেখতে আসা লোকজনের জন্য পূর্ব মাদারবাড়ির বালুর মাঠে রাখা হয় শিল্পীর মরদেহ।

বন্দর নগরীর চৈতন্য গলি কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশেই শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটার দিকে সমাহিত করার আগে দুপুর দুইটার দিকে আইয়ুব বাচ্চুর লাশ নেওয়া হয় নানার বাড়ি পূর্ব মাদারবাড়ি থেকে নগরের জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গনে। সেখানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে প্রিয় শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। জনসমুদ্রে পরিণত হয় জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গন। প্রিয় শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানাতে এসে অনেকের চোখ ভেসে যায় অশ্রুজলে।

ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, আইয়ুব বাচ্চুর বাবা মো, ইসহাক, ছোট ভাই ইরফান চৌধুরী, ছেলে তাজওয়ার আহনাফ আইয়ুব, নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান, নগর পুলিশের কমিশনার মাহাবুবর রহমান, মহানগর বিএনপি’র সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, মহানগর যুবলীগের আহবায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু, চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি, সোলস, রিদম, স্পার্ক, চিটাগং মিউজিক্যাল ব্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের লোকজন।

জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গনে সবার প্রিয় সঙ্গীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর শেষ জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।

সেই কনসার্টের পারিশ্রমিক এতিমখানায় দান করে দিয়েছেন জেমস

একই সময়ে গান শুরু করেন ব্যান্ডশিল্পী জেমস ও প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চু। দুজনের সুখ্যাতিও আকাশছোঁয়া। তাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কও ছিল গভীর।

১৮ অক্টোবর সব সম্পর্ক ছিন্ন করে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন খ্যাতিমান গিটার বাদক ও সঙ্গীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। সঙ্গীতপ্রেমী বাচ্চু ভক্তরা শোকে আচ্ছন্ন। ঠিক একই কারণে মন ভালো নেই গুরু জেমসেরও।

পূর্ব নির্ধারিত একটি কনসার্টে ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় বরগুনা স্টেডিয়ামে গান গাইতে মঞ্চে উঠেছিলেন জেমস। সেখানে গান গাইতে গিয়ে আবেগে কেঁদেছেন নগরবাউলখ্যাত এই ব্যান্ড তারকা।

তার এই আবেগে সহমর্মিতা দেখিয়ে কেঁদেছেন অসংখ্য শ্রোতাও। গান গাওয়ার এক পর্যায়ে আইয়ুব বাচ্চুকে কনসার্টটি উৎসর্গ করার কথা বলতে গিয়ে আবেগতাড়িত জেমস থেমে যান।

এরপর বলেন, ‘আজ অনুষ্ঠানটি করার একদম ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু বহু বছর আগের গল্প বলি, একদিন আমি ও আইয়ুব বাচ্চু আড্ডা দিতে দিতে বললাম, আমাদের মতো এরকম শিল্পীদের… (গল্পটি শেষ করতে পারেননি তিনি।

কাঁদতে শুরু করেন)। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, শো মাস্ট গো অন। তাই চেষ্টা করব।’ এরপর গিটারটা হাতে ধরেন এই শিল্পী। মিনিট পাঁচেক টানা বাজাতে থাকেন।

গিটার হাতেও নিজেকে সামলাতে পারেনটি জেমস। অঝোরে তার চোখ বেয়ে জল ঝরতে থাকে। বাজতে থাকে বেদনা-বিধুর সুর। ‘পদ্মপাতার জল’ গানটি গাওয়ার পর আর নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারেননি। সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে ব্যাক স্টেজে চলে যান!

কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসেন। কনসার্ট থেকে প্রাপ্ত পারিশ্রমিকের এক টাকাও তিনি নেননি। সব অর্থ আইয়ুব বাচ্চুর আত্মার সন্তুষ্টির জন্য এতিমখানায় দান করে দিতে আয়োজকদের বলেছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ১৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নিজ বাসায় হার্ট অ্যাটাক করেন ব্যান্ড লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চু। সেখান থেকে স্কয়ার হাসপাতালে নেয়া হলে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

‘ছয় দিন আগে নিজের কবরের স্থান দেখিয়ে দেন আইয়ুব বাচ্চু’

দাফনের জন্য জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ শনিবার চট্টগ্রামে নেয়া হয়েছে। নগরীর স্টেশন রোডস্থ চৈতন্য গলির বাইশ মহল্লার কবরস্থানে তার দেখিয়ে স্থানে খোঁড়া হয়েছে কবর। তার ইচ্ছায় শনিবার আসর নামাজের পর সেখানেই মায়ের কবরের পাশেই তাকে দাফন করা হবে।

মৃত্যর ছয় দিন আগেও আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন অনুষ্ঠান করতে। সেখানে মায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে নিজের কবরের স্থান দেখিয়ে দেন এলআরবি ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা।

আইয়ুব বাচ্চুর মামা আব্দুল আলীম লোহানী ইউএনবিকে বলেন, ‘মৃত্যুর বিষয়টি তার মধ্যে জানা হয়ে গিয়েছিল।

গত ১২ অক্টোবর শেষ বারের মতো প্রোগ্রাম করতে চট্টগ্রামে এসেছিল আইয়ুব বাচ্চু। তখন চৈতন্য গলির মায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে কবরস্থানের তত্ত্বাবধায়ক জাফরকে বলেছিল, জাফর আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমার মায়ের পাশে আমাকে কবর দিবা।’ তিনি এসময় কবরের জায়গাও দেখিয়ে দেন বলে জানান মামা আব্দুল আলীম।

চৈতন্য গলি কবরস্থানের মতোয়ালী হাফেজ গোলাম রহমান বলেন, ‘আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামে এলে মায়ের কবর জিয়ারত করতে এখানে আসতেন। তার ইচ্ছায় আজ এখানে কবর তৈরি করা হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানী ঢাকায় লাখো ভক্তকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান আইয়ুব বাচ্চু। ৫৬ বছর বয়সে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান তিনি।

পছন্দের মেয়ের সাথে আইয়ুব বাচ্চুকে আমিই বিয়ে করিয়েছি’

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু। রুপালী গিটার ফেলে সবাইকে কাঁদিয়ে গত বৃহস্পতিবার (১৮ অক্টোবর) চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

মোঃ আব্দুল আলীম লোহানী (৬৫)। তিনি আইয়ুব বাচ্চুর ছোট মামা। চট্টগ্রাম শহরের পূর্ব মাদারবাড়ী বালুরমাঠে অবস্থিত নিজ বাসায় বিডি টোয়েন্টিফোর লাইভ ডটকমের কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি মোঃ এস. হোসেন আকাশ এর সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে কান্না জড়িতকণ্ঠে বলেন, বাচ্চু ছোট থেকেই আমাদের কাছে বড় হয়েছে। তার স্মৃতি কখনো ভোলার নয়।

তিনি বলেন, ‘বাচ্চু সব সময় আমাদের বাসায় আসতো। এই তো কয়েকদিন আগেই আমাদের বাসা থেকে এসে ঘুরে গেল। যখনিই চট্টগ্রামে আসতো তখনিই আমার সাথে দেখা করতো।

সময় পেলেই আমার বাসায় আসতো। এখন তো আর কোনোদিন আসবে না। আমাকে ফোন করে বলবে না যে মামা আমি দেশের বাইরে চলে যাচ্ছি। এসে আবার কথা হবে’।

তিনি আরও বলেন, ‘বাচ্চু যে সারা বাংলাদেশের একজন স্টার তা সে আমার এখানে আসলে কখনোই ভাবে নাই। আমার বাসাই এসেই আমার পায়ে ধরে সালাম করতো।

কখনো সে নিজেকে বড় ভাবে নাই। আর সে আমার কাছে ছোট্ট বাচ্চুই রয়ে গেছে। আমি এখনো ভাবতে পারছি না যে আমাদের ছোট্ট বাচ্চুটা আমাদের মাঝে নেই’।

তিনি বলেন, ‘এই বাচ্চুকে আমি বিয়ে করিয়েছি ১৯৯১ সনে। তার পছন্দের মেয়েকেই বিয়ে করিয়েছি। তার শুরুর বাড়ি বরিশালে। বিয়ে করানোর পর সে তার পরিবারকে নিয়ে ঢাকা থাকতেন। ভালোই ছিল তাদের জীবন। আজ সে নেই। তার স্ত্রী, ১ ছেলে ও ১ মেয়ে এখন এতিম হয়ে গেল’।

বাচ্চুর মামা আলীম লোহানী বলেন, ‘আমার বাবা মানে বাচ্চুর নানা মরহুম হাজ্বী আব্দুল লতিফ ও নানু মরহুমা আম্বিয়া খাতুন বাচ্চুকে সবচেয়ে বেশি আদর করেছেন। আর তার জননী বাচ্চুর মা আমার বোন সেও অনেক আদর করেছে’।

তিনি আরও বলেন, ‘বাচ্চুর মা নূরজাহান বেগম ২০০৪ সালের ২ ডিসেম্বর মারা যায়। তার মাকেও আমি দাফন করেছি। আর এখন বাচ্চুকেও আমার হাতেই দাফন করতে হচ্ছে। এই কথা ভাবতেই আমার অবাক লাগছে। আজ আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি সবার কাছে আমার ভাগ্নে বাচ্চুর জন্য দোয়া চাই’।

বিকাল ৪টায় দিকে জামিয়াতুল ফালাহ বিশ্ব মসজিদে নামাজের জানাজা শেষে চৈতন্য গলির বাইশ মহল্লা কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে শায়িত করা হয় জনপ্রিয় এই সংগীত শিল্পীকে।

তথ্যঃ  প্রতিবেদনটি বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল থেকে সংগৃহীত,ছবি ধারন করেছেন কমল রুদ্র