রশীদ ওয়াশে কুপোকাত টাইগার সাকিব বাহিনী

ক্রীড়া ডেস্কঃ কারো মতে আফগান বাশ, আবার কারো মতে রশীদ ওয়াশের আশঙ্কা নিয়েই দেরাদুনের মাঠে নেমেছিল সাকিববাহিনী। টানা পাঁচ বলে পাঁচটি চার মারলেও আফগান বাশ ঠেকাতে পারেননি মুশফিকুর রহিম ।
জয়ের জন্য শেষ বলে দরকার ছিল ৪ রান। স্ট্রাইকে এই সিরিজে প্রথমবারের মতো খেলতে নামা আরিফুল হক। ডানহাতি ব্যাটসম্যান রশিদ খানের গুগলিটা দারুণভাবেই খেলেছিলেন। ছক্কা হবে বলেই মনে হচ্ছিল। তখনো কে জানত, কী ‘ট্র্যাজেডি’ই না অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য!
লং অনে দৌড়ে এসে লাফিয়ে উঠে এক হাতে বলটা প্রথমে ছক্কা হওয়া থেকে বাঁচালেন শফিকউল্লাহ। তবুও বলটা প্রায় চার হয়েই যাচ্ছিল। সীমানার ওপরে শূন্যে থাকা বলটা আবার এক হাতে ফিরিয়ে দিলেন শফিকউল্লাহ। সিদ্ধান্ত গেল টিভি আম্পায়ারের কাছে। টিভির সামনে বসা দর্শকদের মধ্যে তখন নখ কামড়ানো উত্তেজনা। চার নাকি চার নয়?

শফিকউল্লাহ দ্বিতীয়বার যখন বলটা ছুড়ে দিচ্ছিলেন, তার একটা পা বাউন্ডারি দড়ি প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বলটা যখন ছেড়েছেন, তার পা আর বাউন্ডারি দড়ির ব্যবধান ছিল মাত্র ইঞ্চি খানেকের! ৩ রান হলেও ম্যাচ যেত সুপার ওভারে। মাহমুদউল্লাহ তৃতীয় রানের জন্য দৌড়ও দিয়েছিলেন। কিন্তু শফিকউল্লাহর থ্রো থেকে বল ধরে উইকেটরক্ষক মোহাম্মদ শাহজাদ যখন স্টাম্প ভেঙে দিলেন, মাহমুদউল্লাহ বেশ দূরেই, রান আউট!

রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে শেষ ওভারে ৯ রানের প্রয়োজনে বাংলাদেশ ম্যাচ হারল ১ রানে। বৃথা গেল আগের ওভারে মুশফিকুর রহিমের পাঁচ বলে পাঁচ চারের দারুণ প্রচেষ্টাও। দেরাদুনে তৃতীয় ও শেষ টি-টোয়েন্টিতে ১৪৬ রান তাড়ায় বাংলাদেশ থামল ১৪৪ রানে। তিন ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশকে ৩-০ তে হোয়াইটওয়াশ করল আফগানিস্তান।

পরথম দুই ম্যাচেই বাংলাদেশ হেরেছিল কোনো প্রতিরোধ গড়া ছাড়াই। সবচেয়ে বেশি দৃষ্টিকটু ছিল হারের ধরন, খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষা। হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার রাতে শেষ ম্যাচে নেমেছিল বাংলাদেশ। প্রথম দুই ম্যাচে বাংলাদেশ টস জিতেছিল, আফগানিস্তান জিতেছিল ম্যাচ। শেষ ম্যাচে টস ভাগ্য যায় আফগানিস্তানের দিকে। আফগানরা টস জিতে নেয় ব্যাটিং।
বাংলাদেশের বোলিংয়ের শুরুটা ভালো হয়নি। ৫৫ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়ে ফেলেছিলেন মোহাম্মদ শাহজাদ ও উসমান গনি। এরপর আফগান শিবিরে বাংলাদেশের জোড়া আঘাত। অষ্টম ওভারে শাহজাদকে এলবিডব্লিউ করে উদ্বোধনী জুটি ভাঙেন নাজমুল ইসলাম অপু। প্রথম দুই ম্যাচে উইকেটশূন্য থাকা বাঁহাতি এই স্পিনারের সিরিজে এটিই প্রথম উইকেট। যদিও টিভি রিপ্লেতে দেখা যায়, বল লেগেছিল শাহজাদের গ্লাভসে! পরের ওভারে আরেক ওপেনার গনিকে ফেরান আবু জায়েদ রাহী।

তিনে নামা আসগার স্টানিকজাই আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে দলকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন। আফগান অধিনায়কের ১৭ বলে ২৭ রানের ঝড় থামান আরিফুল। এরপর আফগানদের বেশ ভালোভাবেই চেপে ধরে বাংলাদেশ। আবু জায়েদ মোহাম্মদ নবীকে ফেরান দ্রুতই।
নজিবুল্লাহ জাদরানকে ফিরিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৫০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন সাকিব। মাত্র তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ হাজার রান ও ৫০০ উইকেটের ডাবলও ছুঁয়ে ফেললেন বাঁহাতি স্পিন অলরাউন্ডার।
শেষ দুই ওভারে দুর্দান্ত বোলিংয়ে আফগানিস্তানকে দেড়শর আগেই বেঁধে ফেলে বাংলাদেশ। ১৯তম ওভারে ৭ রান দিয়ে সাকিব নেন নজিবুল্লাহর উইকেট। আর শেষ ওভারে নাজমুল মাত্র ৩ রান দিয়ে নেন একটি উইকেট। ৪ ওভারে ১৮ রানে ২ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের সেরা বোলার তিনিই। জায়েদও নেন ২ উইকেট, ২৭ রানে।
স্লো উইকেটে খেলা হলেও ১৪৬ রানের লক্ষ্যটা মোটেও কঠিন কিছু ছিল না। কিন্তু তামিম ইকবাল ফেরেন শুরুতেই। সিরিজে তিন ম্যাচে দ্বিতীয়বারের মতো মুজিব উর রহমানের বলে তামিম ফেরেন ৫ রান করে। দলের সংগ্রহ তখন ১ উইকেটে ১৬। ব্যাটিং অর্ডারে উন্নতি হয়ে এদিন তিনে উঠে এসেছিলেন সৌম্য সরকার। কিন্তু ১৫ রানের বেশি করতে পারেনি। যদিও তার আউটে দায়টা বেশি ছিল লিটন দাসের।

নবীকে সুইপ করে সিঙ্গেলের জন্য কল করেছিলেন লিটন। নন স্ট্রাইকে থাকা সৌম্য মাঝপথে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে ফিরিয়ে দেন লিটন। সৌম্য ফেরার আগেই বল ধরে স্টাম্প ভেঙে দেন নবী। তিন বল পর একইভাবে রান আউট লিটনও (১২)। যেন দ্বিতীয়টা প্রথমটার কার্বন-কপি!

অধিনায়ক সাকিব একটি ছক্কা হাঁকালেও বেশিক্ষণ টেকেননি। করিম জানাতের বলে এক্সট্রা কাভারে সামিউল্লাহ সেনওয়ারির দুর্দান্ত ক্যাচে ফেরার আগে সাকিব করেন ১০ রান। তখন ৫৪ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে অনেকটাই চাপে বাংলাদেশ। তখনো ৬৯ বলে বাংলাদেশের দরকার ৯৩ রান। এরপরই মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহর পঞ্চম উইকেট জুটিতে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। এই দুজনই বাংলাদেশের জয়ের আশা বাঁচিয়ে রাখেন।

প্রথম দুই ম্যাচেই রশিদের স্পিনে ধুঁকেছিল বাংলাদেশ। এদিন তাই রশিদের ওভারগুলো শেষ দিকের জন্য জমিয়ে রেখেছিলেন আফগান অধিনায়ক স্টানিকজাই। শেষ পাঁচ ওভারের তিনটি বরাদ্দ রাখেন রশিদের জন্য!

শেষ তিন ওভারে বাংলাদেশের দরকার ছিল ৩৩ রান। ১৮তম ওভারে রশিদ দেন মাত্র ৩ রান। শেষ ২ ওভারে দরকার ৩০। ১৯তম ওভারে করিম জানাতের প্রথম পাঁচ বলেই মুশফিক হাঁকান টানা পাঁচ চার! শেষ বলে সিঙ্গেল। এই ওভারেই আসে ২১। শেষ ওভারে ৯ রানের সমীকরণটা তখন সহজই মনে হচ্ছিল।

শেষ ওভারে রশিদের প্রথম বলেই মুশফিক খেললেন তার প্রিয় স্লগ সুইপ। কিন্তু বল সীমানা পার হওয়ার মতো জোর ছিল না তার শটে। ধরা পড়লেন নজিবুল্লাহর হাতে (৩৭ বলে ৪৬)। দ্বিতীয় বলে রশিদের গুগলি থেকে মাহমুদউল্লাহ নিতে পারলেন শুধু সিঙ্গেল। পরের বলে আরিফুল নেন দুই। পরের দুই বলে আরিফুল ও মাহমুদউল্লাহর একটি করে সিঙ্গেল। শেষ বলে ৪ রানের প্রয়োজনে আরিফুল শটটা খেলেছিলেন ভালোই। কিন্তু শাফিকউল্লাহর দুর্দান্ত ফিল্ডিংয়ে সান্ত্বনার জয়টাও পাওয়া হলো না বাংলাদেশের।

তখন কিছুক্ষণের জন্যও যেন ফিরে এলো ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বেঙ্গালুরুর সেই স্মৃতি। সেদিন ভারতের কাছে ১ রানের হার এখনো পোড়ায় বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের। কাকতালীয়ভাবে এবার সেই ভারতেরই আরেক মাঠে আরেকটি ১ রানের হার সঙ্গী হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটে!

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

আফগানিস্তান: ২০ ওভারে ১৪৫/৬ (শাহজাদ ২৬, গনি ১৯, স্টানিকজাই ২৭, সেনওয়ারি ৩৩*, নবী ৩, নজিবুল্লাহ ১৫, শফিকউল্লাহ ৪, রশিদ ১*; নাজমুল ২/১৮, জায়েদ ২/২৭, আরিফুল ১/১৩, সাকিব ১/১৬)

বাংলাদেশ: ২০ ওভারে ১৪৪/৬ (লিটন ১২, তামিম ৫, সৌম্য ১৫, মুশফিক ৪৬, সাকিব ১০, মাহমুদউল্লাহ ৪৫, আরিফুল ৫*; রশিদ ১/২৪, মুজিব ১/২৫, করিম ১/৪৪)

ফল: আফগানিস্তান ১ রানে জয়ী

সিরিজ: তিন ম্যাচের সিরিজ আফগানিস্তান ৩-০ ব্যবধানে জয়ী

ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মুশফিকুর রহিম

ম্যান অব দ্য সিরিজ: রশিদ খান।