বিটিভি‘র’ঝন্টু-পন্টু’ এবং একজন ব্ল্যাক আনোয়ার

লুৎফর রহমান রিটন :   বিটিভি মানে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সেই ছেলেবেলার। ১৯৭২ সাল। সদ্য স্বাধীন দেশ। শান্তশিষ্ট বালক আমি। থাকি ওয়ারিতে, হেয়ার স্ট্রিটে। র‍্যাংকিন স্ট্রিটের ইসলামিয়া মডেল প্রাইমারী স্কুলে পড়ি। ওটা ফ্রি স্কুল ছিলো। কোনো মাইনে দিতে হতো না মাস পেরুলে। দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা ওখানে পড়তো। ওদের অধিকাংশই থাকতো আশপাশের ঝুপড়িঘর কিংবা বস্তি টাইপের বাড়িতে। আমার সহপাঠীদের অনেকেই কাজ করতো লেদ মেশিন কারখানায়। ওদের পোশাক-আশাকের সঙ্গে আমার পোশাক আশাকের বিস্তর ব্যবধান ছিলো। আমার বাবা মোটেও গরিব ছিলো না। কিন্তু তার পরেও ক্যানো যে আমায় তিনি ফ্রি একটা প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করালেন সেটা একটা বিস্ময়ই ছিলো আমার কাছে। কিন্তু কিছুদিন পরেই বুঝতে পেরেছিলাম, এই স্কুলে ভর্তি হওয়াটা আমার জন্যে খুব উপকারী একটা ব্যাপার হয়েছে। শ্রেণিবৈষম্যের দেয়ালটা আমি ভাঙতে পেরেছিলাম শৈশবেই, ওই স্কুলে পড়ার সুবাদে। আমার ক্লাশমেটরা দরিদ্র ছিলো কিন্তু মানুষ হিশেবে ছিলো অসাধারণ একেকজন। প্রথম প্রথম আমাকে একটু এড়িয়ে চললেও কিছুদিনের মধ্যেই আমাকে ওরা আপন করে নিয়েছিলো। তখন, আমাকে মাঝে মধ্যে টেলিভিশনে দেখা যেতো বলে ওদের গর্বের সীমা ছিলো না। যেদিন সন্ধ্যায় টিভিতে আমার কোনো অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো তার পরের দিন ক্লাশে একটা হুল্লোড় পড়ে যেতো–তোমারে দেখছি তোমারে দেখছি!

বিটিভির কার্যালয় ও স্টুডিও তখন ডিআইটি ভবনের নিচ তলায়। বলছি ১৯৭২/৭৩ সালের কথা। শাদাকালো টিভি। রঙিন জামা পরে ছোটদের অনুষ্ঠানে আমি ছবি আঁকি। কবিতা আবৃত্তি করি। গান গাই। অভিনয় করি।উপস্থাপনা করি। এক কথায় সবই করি। কিন্তু আমার রঙিন জামাটি পর্দায় রঙিন দেখায় না। কিন্তু ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইটের অপরূপ ক্যারিশম্যাটিক ঝলমলে একটা রূপালি আলোয় উদ্ভাসিত থাকতো টিভিপর্দা। আমাদের কোনো টিভিসেট ছিলো না। তাই আমার বাড়ির কোনো সদস্য আমাকে দেখতে পেতো না। তখন বিটিভির সমস্ত অনুষ্ঠানই ছিলো লাইভ অর্থাৎ সরাসরি সম্প্রচার। এখন ভাবতে অবাক লাগে সরাসরি সম্প্রচারের সেই বিস্ময়কর সময়ে আধ ঘন্টার নাটকেও আমি পারফর্ম করতাম অনায়াসে। রেকর্ডিং সিস্টেম চালু হবার পর মাঝে মধ্যে আমার বড় ভাই মিজান তাঁর বন্ধু ফয়সলদের বনগ্রামের বাড়িতে আমাকে নিয়ে যেতো। ফয়সল ভাইদের ডায়নিং রুমে বসে টিভি পর্দায় নিজেকে দেখে ভীষণ অবাক হতাম। তবে লজ্জাও পেতাম প্রচুর। ফয়সল ভাইয়ের অনেকগুলো সুন্দরী বোন ছিলো। আমার অনুষ্ঠান চলাকালে তারা বারবার আমার দিকে ফিরে ফিরে তাকাতেন আর নিজেরা নিজেরা কী সব মন্তব্য করতেন ফিঁসফিসিয়ে। আমি লজ্জায় তাকাতে পারতাম না ওদের দিকে।

তারপর দিন যায়।
আমি বড় হই।
ডিআইটি থেকে বিটিভি চলে যায় রামপুরায় বিশাল নিজস্ব ভবনে।
আমার অনুষ্ঠান করা চলতে থাকে।
তারপর শাদাকালো টিভি একদিন রঙিন হয়। আমার নিজের রূপালি চেহারাও বর্ণিল হয়ে ওঠে টিভি পর্দায়। আমার পরনের রঙিন জামাটা একদম ঠিকঠাক একই রঙে প্রদর্শিত হয় চোখের সামনে।
সে এক স্বপ্নের দিন। সে এক ঝলমলে দিন। উজ্জ্বল উচ্ছ্বল প্রাণময় দিন।

আসে ১৯৮৭।
বিটিভির ছোটদের অনুষ্ঠানের কিংবদন্তী প্রযোজক কাজী কাইউম একদিন আমাকে বললেন, একটা স্ক্রিপ্ট লিখে দাও তো।
–কিসের স্ক্রিপ্ট?
–নাটকের। ছোটদের একটা সিরিয়াল করবো নেক্সট প্রান্তিক থেকে।
তখন তিন মাস পর পর একটা প্রান্তিক হিশেবে বিবেচিত হতো এবং একটা প্রান্তিক শেষ হবার আগেই পরিকল্পনা করা হতো পরবর্তী প্রান্তিকের অনুষ্ঠানমালার।
–কতো পর্ব চলবে কাইউম ভাই? কতো বড় লিখতে হবে?
–আপাতত একটা সিনপসিস লিখে দাও। কর্তৃপক্ষ রাজি হলে দুই পর্ব একবারে লিখে দিও।

টিভি নাটক নির্মাণ উপযোগী একটা গল্পের খসড়া মাথায় রেখে রচিত হলো এক প্যারার সিনপসিস–ঝন্টু-পন্টু। বন্ধুদের গল্প। এক চিমটি লবণ এক মুঠ গুড় আর আধাসের পানি টাইপের রেসিপি। সম্পর্ক-বন্ধুত্ব-হাস্যরস-শিশুঅধিকার-প্রাণিদের প্রতি ভালোবাসা-দেশপ্রেম ইত্যাদি মিলিয়ে একদল শিশুকিশোরের অভিযান সম্পর্কিত গল্প নিয়ে তৈরি হলো ঝন্টুপন্টু এবং প্রথম পর্ব প্রচারের দিন থেকেই সেটা হয়ে উঠলো ব্যাপক জনপ্রিয়, ছোটদের কাছে। শিশুশিল্পী দোদুল,পান্থ,তারিন, রাজিব, রাশেদ, সুমনদের সঙ্গে ব্ল্যাক আনোয়ারকে নিয়ে তরতর করে এগিয়ে চললো একেকটা পর্ব। বিপুল জনপ্রিয় হয়ে উঠলো একেকজন শিশুশিল্পী। বিশেষ করে তারিন।

শিশুশিল্পীরা ব্যাপক উৎসাহে রিহার্সালের পর স্ক্রিপ্ট মুখস্ত করে স্টুডিওতে আসতো রেকর্ডিং-এর সন্ধ্যায়। কিন্তু সমস্যা করতেন পটল মামার চরিত্রে অভিনয় করা ব্ল্যাক আনোয়ার। তিনি কিছুতেই রিহার্সালে আসতে চাইতেন না। স্ক্রিপ্ট নিয়ে চলে যেতেন তাঁর ভেসপা চালিয়ে। তাঁর অভিনীত গুলবাজ পটল মামা চরিত্রটি খুবই জনপ্রিয় হওয়াতে আমি পড়লাম বিপদে। রেকর্ডিং-এর সময় দেখা যেতো একটা বাক্যও মুখস্ত করে আসেননি তিনি। ফলাফল বারবার কাট। বারবার কাট হওয়ার পর খামোখাই ফাঁপড় নিতেন তিনি সহশিল্পী মানে শিশুশিল্পীদের ওপর। ‘পিচ্চি’ চরিত্রে অভিনয় করা রাশেদ নামের বাচ্চাটা একদিন স্টুডিও ভর্তি অভিভাবক ও কলাকুশলীদের সামনে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিলো ব্ল্যাক আনোয়ারকে। নাটকটির লেখক ও পরিচালক হিশেবে রেকর্ডিং-এর সময় ব্ল্যাক আনোয়ারের কারণে আমার উঠতো নাভিশ্বাস। ব্ল্যাক আনোয়ারের সংলাপ বলতে না পারার কারণে কাট হওয়া দৃশ্যটাকে ফ্রিজ করে অর্থাৎ আর্টিস্টদের যথাস্থানে যথাভঙ্গিতে স্ট্যান্ডবাই রেখে পরবর্তী টেক-এর জন্যে ক্যামেরা অন করতে হতো।
এইরকম একটা দৃশ্যধারণের সময় ব্ল্যাক আনোয়ার স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী সংলাপ অনুসরণ না করে জোড়াতালি দিয়ে তার ডায়ালগ ডেলিভারি দিলো ঠিকই কিন্তু পিচ্চি রাশেদ তার সংলাপ উচ্চারণ থেকে বিরত থাকলো। ব্ল্যাক আনোয়ার রেগে গিয়ে ধমকে উঠলেন–অই ব্যাটা কথা কছ না ক্যা! আমার ডায়লগের পরে তো তর ডায়লগ দেওনের কথা! ভুইলা গেছস?

রাশেদ বলে উঠলো–আমি তো ভুলিনি তুমিই ভুলে গেছো মামা! আমি তো কিউ পাইনি মামা তোমার কাছ থেকে! তোমার ডায়ালগে তো শেষ লাইনটা ছিলো–বলে হবহু আমার লেখা সংলাপটা উচ্চারণ করলো রাশেদ। অর্থাৎ পিচ্চিটা তার নিজের সংলাপের পাশাপাশি সহশিল্পীর বলা শেষ লাইনটাও মুখস্ত করে রেখেছে! স্ক্রিপ্ট অনুসারে সহশিল্পীর পূর্ববর্তী সংলাপের শেষ বাক্য বা শেষ শব্দকে বলে কিউ। পিচ্চি রাশেদ কিউ পায়নি ব্ল্যাক আনোয়ারের কাছ থেকে।

স্টুডিওতে হাসির হুল্লোড়। ব্ল্যাক আনোয়ার পর্যুদস্ত। যথারীতি তাকে উদ্ধারে আমি হলাম প্রম্পটার। প্রতি পর্বের মতো। ক্যামেরার এপাশ থেকে স্ক্রিপ্ট দেখে দেখে ব্ল্যাক আনোয়ারের সংলাপটা আমি বলি আর সেই অনুযায়ী ব্ল্যাক আনোয়ার ডেলিভারি দেয়। তাও দুতিনটে কাট ছাড়া হয় না।

ব্ল্যাক আনোয়ার অনেক গুণী শিল্পী সন্দেহ নেই। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুবাদে তিনি অনেক বিখ্যাতও। কিন্তু তাই বলে দিনের পর দিন নাট্যকার নির্দেশক এবং সহশিল্পীদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সংলাপ মুখস্ত না করে স্টুডিওতে আসবেন সেটা তো মেনে নেয়া যায় না!
দিনে দিনে আমি ভীষণ বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম ব্ল্যাক আনোয়ারে ওপর।

একদিন আমি আমার অনেক প্রিয় শিল্পী ব্ল্যাক আনোয়ারকে একটা উচিৎ শিক্ষা দিতে মনস্থির করলাম। কাইউম ভাইকে বললাম–একটু সাইজ করি? একটু টাইট দেই ব্ল্যাক আনোয়ারকে? রেগুলার খুব পেইন দিচ্ছে।
কাইউম ভাই সম্মতি দিলেন– হ্যাঁ আমি জানি। অনেক হয়েছে, আর না। দ্যাও টাইট।
আমি বললাম–মাইরা ফেলি!
একটু চিন্তা করে কাইউম ভাই বললেন–মেরে ফেলবে? নাহ্‌ একদম জানে মেরো না। ডায়ালগ মুখস্ত যেহেতু করে না দাও একটু কমিয়ে দাও।

পরের পর্বে রেকর্ডিং-এর দিন দেখা গেলো পুরো স্ক্রিপ্টে ব্ল্যাক আনোয়ারের ডায়ালগ আছে মাত্র একটি! মৃত সৈনিকের মতো দু’তিনটে হাঁটা চলা শট ছাড়া আর কোনো সংলাপই নেই তাঁর। উলটো মরার ওপর খাড়ার ঘা হিশেবে নতুন একটা চরিত্রের আবির্ভাব ঘটালাম যে চরিত্রটায় অভিনয় করতে এলেন আরেক বিখ্যাত কমেডিয়ান আনিস। চরিত্র অনুযায়ী ‘লিল্লুছে ছিল্লু’ আর ‘লাটাকবম’ ধরণের অর্থহীন কয়েকটা শব্দ তিনি উচ্চারণ করলেন একাধিকবার। এবং আনিস ভাই এক পর্বেই মাতিয়ে দিলেন দর্শকদের।

অহংকারী সিনিয়র শিল্পী ব্ল্যাক আনোয়ার, আমাকে অবজ্ঞা করা বিখ্যাত শিল্পী ব্ল্যাক আনোয়ার আড়ালে ডেকে নিয়ে আমার কাঁধে একটা হাত রেখে বিস্ময় আর হতাশা প্রকাশ করলেন–এইটা একটা কাম করলা মিয়া! পুরা স্ক্রিপ্টে আমার লিগা ল্যাখছো মাত্র একটা ডায়লাগ!

আমি বললাম–আপ্নেরে কষ্ট থিকা বাঁচাইয়া দিলাম। কষ্ট কইরা সংলাপ মুখস্ত করোনের ঝামেলা থিকা আপ্নে তো বাঁইচা গেলেন আনোয়ার ভাই!

অটোয়া ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮