রাতারাতি আওয়ামী সমর্থক হিমেল-মজিবর গংয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ

আজকের নারায়নগঞ্জ ডেস্কঃ রাতারাতি আওয়ামী সমর্থক নেতা বনে যাওয়া নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতি শাহরিয়ার রেজা হিমেল ও তার বাবা-চাচার বিরুদ্ধে হত্যার হুমকি, জমি দখল, মারধর, মিথ্যা মামলায় হয়রানিসহ একের পর এক অভিযোগ আসতে শুরু করেছে।

তাদের বিরুদ্ধে পৃথক দু’টি ভুক্তভোগী পরিবার জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেছে। পুরো পরিবারকে হত্যার পর লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকির অভিযোগ এনে কাফনের কাপড় পরে মানববন্ধন করেছে এক প্রবাস ফেরত ব্যবসায়ী ও তার স্ত্রী। প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী পরিবারটি জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন।

নজরুল ইসলামের এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে বুধবার (১৪ অক্টোবর) তার বাড়ি পরিদর্শন করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (‘ক’ সার্কেল) মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা অভিযোগকারীর সাথে কথা বলেছি। তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে লিখিত দেওয়ার জন্য বলেছি। লিখিত অভিযোগ দিলে সে অনুযায়ী তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ ব্যাপারে থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়ার জন্যে বলা হলে ভুক্তভোগি নজরুল ফতুল্লা মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযুক্ত শাহরিয়ার রেজা হিমেল নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে প্রথম সহসভাপতি। তার চাচা স্থানীয় যুবলীগ নেতা মজিবর রহমান। মজিবর রহমান পূর্বে বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। শুধু মজিবরই নন তাদের পুরো পরিবারই বিএনপি সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিল এলাকায়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগার হয়ে যান তারা। রাতারাতি স্থানীয় যুবলীগের নেতা
বনে যান মজিবর রহমান। যুবলীগের কোনো কমিটিতে তার পদ না থাকলেও স্থানীয়ভাবে বেশ প্রভাব রয়েছে তার। এদিকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত না থাকলেও হিমেল জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে পেয়ে যান প্রথম সহসভাপতির পদ। বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগার বনে যাওয়া পরিবারটির কারণে স্থানীয় ত্যাগী ও তৃণমূলের আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতারাও কোনঠাসা।

ছাত্রলীগ নেতা হিমেলের বাবা শাহ্জালাল, চাচা মজিবর রহমান, শাহ্জাহান, জুয়েলের বিরুদ্ধে ফতুল্লার সস্তাপুর এলাকায় ভূমিদস্যুতার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্নজনের জমি দখল করারও অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চাঁদাবাজিরও অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগ নেতা শাহরিয়ার রেজা হিমেল ও তার পরিবারের লোকজনের বিরুদ্ধে।

এই ছাত্রলীগ নেতা ও তার পরিবারের লোকজনের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ তুলে গতকাল মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে কাফনের কাপড় পরে জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেছেন প্রবাস ফেরত ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী নাজমা আক্তার। ডিসি ও এসপির কার্যালয়ে হিমেলসহ তার বাবা ও দুই চাচার বিরুদ্ধে হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যায় ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকির অভিযোগ তুলে লিখিত দিয়েছেন বলে জানান ওই ব্যবসায়ী।

লিখিত অভিযোগে ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম (৫২) বলেন, সস্তাপুরের লাল চান মিয়ার ছেলে শাহজালাল ও শাহজাহান তার সস্তাপুর মধ্যপাড়া এলাকার জমি দখল করতে চায়। এই জন্য তারা বিভিন্ন সময়ে হুমকি দিচ্ছে। গত ৮ অক্টোবর শাহজালালের ছেলে ছাত্রলীগ নেতা শাহরিয়ার রেজা হিমেল, চাচা যুবলীগ নেতা মজিবর রহমান, শাহ্জালাল ও জুয়েলসহ ২০/২৫ জন অস্ত্রসহ দেশীয় দা, চাপাতি, ছুরি, হকিস্টিক, লোহার রড নিয়ে তার কাছে
৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। বাড়ি থেকে উৎখাতের হুমকি দেয়। একই সাথে তাকে ও তার পরিবারের সকল সদস্যদের হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার হুমকি দেয় বলে অভিযোগ ওই ব্যবসায়ীর।

নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রলীগ নেতা হিমেলের পুরো পরিবার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত। অস্ত্র নিয়ে আমার বাড়িতে ঢুকে হিমেল ও তার বাপ-চাচা আমাদের হুমকি-ধমকি দেয়। এক যুগ যাবৎ তারা আমার তিনটা বাড়ি দখল করে রাখছে তারা। এখন যেই বাড়িটাতে থাকতেছি সেইটাও দখলের পায়তারা করতাছে। তাদের এই দখলদারিত্বের জন্য বাধ্য হয়ে কাতার থেকে চলে আসতে হয়েছে।’

বিগত সময়ে একাধিকবার পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েও কোন লাভ হয়নি দাবি করে ভুক্তভোগী ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি কাফনের পইড়া নামতে বাধ্য হইছি। আমার হারানোর আর কিছু নাই।’ মানববন্ধনে স্বামীর সাথে কাফনের কাপড় পড়ে উপস্থিত ছিলেন স্ত্রী নাজমা আক্তারও।

এর আগে গত ৪ অক্টোবর মারধরের পর ‘মিথ্যা মামলা’ দিয়ে হয়রানির অভিযোগ করে ছাত্রলীগ নেতা হিমেল ও তার চাচা যুবলীগ নেতা মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করে সস্তাপুর এলাকার রিকশার গ্যারেজ মালিকের পরিবার। মামলা দিয়ে তাদের পরিবারকে হয়রানি এবং আরো মামলা দিয়ে এলাকাছাড়া করার হুমকি দেয়ার অভিযোগ করে মানববন্ধন করেন শফি প্রধান, তার স্ত্রী ও তিন ছেলে।

মানববন্ধনে ফতুল্লার সস্তাপুর এলাকার বাসিন্দা রিকশার গ্যারেজ মালিক শফি প্রধান জানান, ছাত্রলীগ নেতা শাহরিয়ার রেজা হিমেলের চাচা স্থানীয় যুবলীগ নেতা মজিবুর রহমান, জুয়েলসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করে মারধরের অভিযোগে গত ডিসেম্বরে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা করে তার ছেলে মো. বাদল। এই মামলা তুলে না নেওয়ায় বাদী ও তার পরিবারের লোকজনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ নেতা হিমেল তার অনুসারীদের দিয়ে দু’টি সাজানো মামলা করে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন শফি প্রধান। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানান শফি প্রধান।

হিমেল ও মজিবুরের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ তুলে গত ২৮ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন সস্তাপুরের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা জুলহাস মিয়া। ভুক্তভোগী ওই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘অবৈধভাবে দখল করে রাখা জমি লিখে দেওয়ার জন্য কয়েকবার হুমকি দেওয়া হয়েছে। বাড়িতে এসে শাসিয়েছে তারা। স্থানীয়ভাবে ভূমিদস্যু, সন্ত্রাসী বলে তাদের পরিচিতি আছে। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ভূমিদস্যু, সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি হয়ে আছি। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনার কাছে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ন্যায় বিচার চাই।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি শাহরিয়ার রেজা হিমেল ও তার চাচা স্থানীয় যুবলীগ নেতা মজিবর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও তাদের পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আসলাম হোসেন বলেন,অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অভিযুক্তদের অবশ্যই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।