মতামত : এন.আর.সি প্রক্রিয়ার নামে দেশজুড়ে বাঙ্গালি নিধনের চেষ্টা!

 

? মুন্সি দরুদ :   এনআরসি প্রক্রিয়ার নেপথ্যে বলতে গেলে ‘অসম আন্দোলন’ ভাবাচ্ছে । ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে অসমে অবৈধ অণুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে অসমীয়া মানুষের করা আন্দোলনই ‘অসম আন্দোলন’ । ১৯৮৫ সালে আন্দোলনকারী ও ভারত সরকারের মধ্যে হওয়া চুক্তির ফলে অসম আন্দোলন সমাপ্ত হয়েছিল । ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তি যুদ্ধের সময় বহু মানুষ ভারতের অসমে এসেছিলো । বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেকে বাংলাদেশ ফিরে যায় ও অনেকে অসমে রয়ে যায় । ১৯৮৫ সালের ১৫ আগষ্ট রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার অসম চুক্তি সাক্ষর করেন ।

অসম চুক্তির শর্তগুলো হচ্ছে : ১) ১৯৬১ সালের আগে বাংলাদেশ থেকে অসমে আসা মানুষদের নাগরিকত্ব প্রদান ও ভোটাধিকারের সুবিধা দেওয়া । ২) ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অসমে মানুষদের ভোটাধিকার সুবিধা বাতিল করা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা প্রদান করা । ৩) ১৯৭১ সালের পরে অসমে আসা বাংলাদেশী মানুষদের চিহ্নিত করে অসম থেকে বহিষ্কার করা । (সুত্র – গুগল)

আমার মত, রাজীব গান্ধীর ‘অসম চুক্তি’কে হাতিয়ার করে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার দেশজুড়ে বাঙ্গালিদেরকে নাস্তানাবুদ করছে । বাঙ্গালিরা ভিন রাজ্যে কাজ করতে গেলে গণপিটুনি দিচ্ছে, মেরে দিচ্ছে । বাঙ্গালিরা দুশ্চিন্তায় রয়েছে । এমন অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গ কিন্তু স্বস্তিতে নেই । পশ্চিমবঙ্গ নাকি রাঢ়বঙ্গের দেশ আর পশ্চিমবঙ্গের পাশেই প্রতিবেশী বাঙ্গালি রাষ্ট্র বাংলাদেশ রয়েছে । বাংলা ভাষার গর্বিত দেশের নাগরিকরা নাকি খাঁটি বাঙ্গালি । ভারতের অসম, শিলচর, মেঘালয়, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গে বাঙ্গালি বা বাংলা ভাষার মানুষ রয়েছে । ভারত বৈচিত্রপূর্ণ দেশ যেখানে বহু ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, জাতির বাস । ভারতে বাংলা ভাষার মানুষ, বাঙ্গালি মানুষ থাকতেই পারে তাই বলে সবাইকে বাংলাদেশী বলা যাবে না ।

তবে ভারতের অসমের নাগরিকপঞ্জি তালিকা থেকে ৪০ লক্ষের বেশি বাঙ্গালির নাম বাদ দিয়ে ভারতীয় কেন্দ্র সরকার তাদেরকে অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশী ঘোষণা করেছে । অসম থেকে বাঙ্গালি নিধন শুরু করে বিভিন্ন রাজ্য থেকে বাঙ্গালি নিধন করার চেষ্টা চলছে । দিল্লিকে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশীমুক্ত করার ডাক দিয়েছে বিজেপি সরকার । ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় অনেকেই বাংলাদেশ ত্যাগ করে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে নাগরিত্ব পেয়েছেন । ফলে অসমের নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ যাওয়া বাঙ্গালিদের সবাইকে বাংলাদেশী বলা যায় না । বাংলা ভাষী মানুষ হলেই বাংলাদেশী হয় না । অসমের বাঙ্গালিরা যেমন শান্তিতে নাই তেমন রোহিঙ্গারাও অশান্তিতে রয়েছে ।

বাংলাতে প্রবাদ আছে – “বাঙ্গালির মাথা আর মারোয়াড়ীর খাতা” তো ভারতেও বাঙ্গালিদেরকে খাতা কলমে মারছে বিজেপি সরকার । ভারতে বাঙ্গালি রাজ্যগুলো ও অন্যান্য রাজ্যগুলো থেকে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার বাঙ্গালি খেদাও অভিযান চালাচ্ছে । বাংলাদেশ বাঙ্গালি গর্বে গর্বিত তাই বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙ্গালিদের বাংলাদেশী ঘোষণা করতে বিজেপি দিধা বোধ করছে না ।

সংবাদ মাধ্যমে জেনেছি — “পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ঞ গান্ধী স্বয়ং একসময় পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী সমস্যাকে টাইম বোমার সাথে তুলনা করে রাষ্ট্রপতির কাছে রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন । ২০০৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের রিপোর্ট অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ৭৯ লক্ষ ।”

সংবাদ মাধ্যমে আরো জেনেছি :- ২০০৫ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, “বাংলাদেশ থেকে বাংলায় অনুপ্রবেশ ক্রমশ বেড়েই চলেছে । এটি এখন পশ্চিমবঙ্গের কাছে এক অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে । ভোটার তালিকায় অনেক বাংলাদেশি নাগরিকের নামও রয়েছে ।”

এই সব সূত্র ধরেই বিজেপি বাঙ্গালি নিধন শুরু করেছে । অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যগুলোতে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ চিহ্নিত করা ৷ একই ভাবে পাঞ্জাব, রাজস্থান ও কাশ্মিরে পাকিস্তানি অনুপ্রবেশ রোধ করা । অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারকে চাপে রেখে পশ্চিমবঙ্গ ও অসমকে নিয়ন্ত্রণ করাই মোদী সরকারের মূল উদ্দেশ্য । তাহলে বোঝা যাচ্ছে বিজেপি সরকার পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি পক্রিয়া শুরু করতে আর দেরি করবে না । রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিজেপি সরকার বাংলাদেশকে বলেছিলো – ‘পাশে আছি ।’

এবার বাংলাদেশ সরকার বিজেপির ষড়যন্ত্র বুঝুক । বাংলাদেশ বিজেপি সরকারকে বিশ্বাস করছে কি করে ? বিজেপি সরকার পুরনো ইতিহাস হাতিয়ার করে বাঙ্গালির মধ্যে জাতির লড়াই, ভাষার লড়াই লাগানোর চক্রান্ত করছে ।

মানবিক দায়ের কারণে রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ এখন বিপাকে পড়েছে । রোহিঙ্গা চাপ, অসম চাপ ও পশ্চিমবঙ্গে বাঙ্গালি নিধন হলে বাংলাদেশ ঠেলা সামালাবে কি করে ?” এই মুহুর্তে বাঙ্গালিদেরকে সচেতন হতে হবে ।

— মুন্সি দরুদ ( কলম মানব )
বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত