যমুনার সেই ক্যান্টিনবয় টুটুলই ব্রাজিল বাড়ির মালিক !

 আজকের নারায়নগঞ্জ ডেস্ক:  বিশ্বজুড়ে আলোচিত ব্রাজিল বাড়ীর মালিক কে এই টুটুল ? তখন নিজেকে  বেসরকারী কোম্পানীর চাকুরে হিসেবেই নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের অনুসন্ধানী প্রোগ্রাম সার্চলাইটের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর নেপথ্যে কাহিনী। আলাদ্দিনের চেরাগ পাওয়া টুটুলের দুর্নীতির ও অঢেল টাকার মালিক বনে যাওয়ার গল্প।

এতদিন ফতুল্লার লোকজন জানলেও ব্রাজিল বাড়ী আলোচনায় আসায় এলাকার খ্যাতির কারনে কেউ কোন তথ্য  প্রকাশ করেনি।২৪

ফতুল্লার লালপুরের জয়নাল আবেদীন টুটুল যার বাড়িটি ছিল ব্রাজিল বাড়ি হিসেবে পরিচিত। সাত তলা ভবনের বাইরে ছিল ব্রাজিলের পতাকা অঙ্কন করা। নিজের ফ্ল্যাটকে সাজিয়েছেন ব্রাজিলের পতাকা, খেলোয়াড়দের ছবি ও ব্রাজিলীয় উপকরণ দিয়ে।

ফুটবল বিশ্বকাপের সময় বাড়িতে এসেছিলেন ব্রাজিল রাষ্ট্রদূত। ব্রাজিলের খেলা দেখতে গিয়েছিলেন রাশিয়াতেও। এনিয়ে যখন সবার নজর ব্রাজিল বাড়িকে ঘিরে তখনই বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
২৭ জুলাই শুক্রবার রাতে ওই অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয় টুটুলের আদ্যোপান্ত।

এতে বলা হয় টুটুলের বাবা রফিক মিয়া ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পঞ্চবটিতে অবস্থিত রাষ্ট্রয়াত্ব তেল কোম্পানী যমুনা অয়েল কোম্পানীর সিকিউরিটি গার্ড।

তার বাবার মৃত্যুর পর যুমুনা অয়েল কোম্পানীতে চাকরি পায় টুটুল। নো ওয়ার্ক নো পে পদ্ধতিতে যমুনা অয়েল কোম্পানীর ক্যান্টিনে দৈনিক ৫৫ টাকায় বেতন ছিল টুটুলের। সেখানে মূলত সে প্লেট ধৌত করতো। পরবর্তীতে যমুনা অয়েল কোম্পনীর নিয়ন্ত্রণ করা তিনজন কর্মকর্তা ও দুইজন সিবিএ নেতার কল্যাণে টুটুল বাগিয়ে নেন অপারেটরের পদ। ভাগ্য খুলে যায় তার।

কারণ প্রতিদিন বিভিন্ন তেলবাহী গাড়িতে তেল চুরির মূল হোতা হল ওই অপারেটর। এক পর্যায়ে চাকরি নেন গ্রেজারের। গ্রেজার মূলত বড় বড় তেল মাপায় জড়িত। যমুনা অয়েল কোম্পানীর সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন গ্রেজারের দৈনিক আয় কমপক্ষে ১ লাখ টাকা। কখনো কখনো মাসে এ টাকার অংক ছাড়িয়ে যায় কোটিতে।

সার্চলাইট শীর্ষক অনুষ্ঠানে এও বলা হয়, মূলত তেল চুরির টাকা দিয়ে ফতুল্লার লালপুরে আলিশান ব্রাজিল বাড়ি গড়ে তুলেন টুটুল। যার পরতে পরতে রয়েছে আভিজাত্যের ছাপ।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে যাদের নামে মাত্র ১৫ শতাংশ জমি রয়েছে তাদেরই এখন ফতুল্লার লালপুরে ব্রাজিল বাড়ির পাশাপাশি কিনেছেন প্রচুর জমি। নারায়ণগঞ্জের ইউসিবি ব্যাংক থেকে ১০ বছর মেয়াদে ২০ লাখ টাকা লোন নিলেও মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে পরিশোধ করা হয় টাকা।

টুটুলের এসব কাহিনী ব্রাজিল বাড়ির বদৌলতে সকলে পজেটিভ বিষয় জানলেও মুদ্রার বিপরীতে তার উল্টো। ইতিমধ্যে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে একবার বদলিও করা হয়। দুদকে জমা পড়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। তবে টুটুলের দাবী তিনি আত্মীয় স্বজন ও পারিবারিক সূত্র ধরেই টাকা-পয়সার মালিক হয়েছেন, বাড়ি করেছেন।

গত ২২ জুন মিডিয়ার কল্যাণে আলোচনায় আসা ব্রাজিল বাড়িতে আসেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত জোয়াও তাবাজারা ডি অলিভেরিয়া জুনিয়র। সেখানে তিনি ভক্তদের নিয়ে ফুটবল ম্যাচও উপভোগ করেছেন। এরই মধ্যে ব্রাজিলের ফ্যান কার্ড নিয়ে প্রিয় দল ব্রাজিলের খেলা দেখতে রাশিয়ার মাঠে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন সেই ব্রাজিল বাড়ির মালিক জয়নাল আবেদীন টুটুলও অভিভূত ব্রাজিলের লোকজনদের কাছে পেয়ে।

জানা গেছে, ফতুল্লার লালপুর এলাকায় জয়নাল আবেদীন টুটুলের মালিকানাধীন বাড়িটিকে সবাই ব্রাজিল-বাড়ি নামেই চেনেন। ৭ তলা বাড়িটির পুরোটাই অঙ্কিত হয়েছে ব্রাজিলের পতাকার রঙে। বাড়ির ছাদে উড়ছে বড় বড় পতাকাও। বাড়ির প্রধান ফটকে লেখা রয়েছে ব্রাজিল বাড়ি। বাড়ির প্রতিটি কোনেই রয়েছে ব্রাজিলের নানা নিদর্শন।

ব্রাজিলের একজন ভক্ত হিসেবে নিজের বাড়িটি ব্রাজিলের পতাকার রঙে রাঙিয়ে ব্রাজিলের হাইকমিশনের দৃষ্টিতে চলে আসেন টুটুল। এরপর পেয়ে যান তিনি রাশিয়ার মাঠে ব্রাজিলের খেলা দেখার ফ্যান কার্ড। গত ১৩ জুন বিশ্বকাপ খেলা দেখতে রাশিয়ায় যান টুটুল। ১৯জুন তিনি দেশে ফিরেন
এরই মধ্যে ঘোষণা হয় ২২ জুন ব্রাজিলের খেলার দিন আয়েছিসবেন রাষ্ট্রদূত সহ অন্যরা। দুপুরে বাড়িতে আসার সময়ে কিছুটা দূরে গাড়ি রেখে রিকশায় চড়ে ব্রাজিল বাড়িতে পৌছান অ্যাম্বাসেডর জোয়াও তাবাজারা ডি অলিভিরা জুনিয়র। তখন বাড়ির গেটে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান টুটুল সহ অন্যরা। ফুল দিয়ে বরণের পর নেওয়া হয় ভেতরে। একে একে বাড়ির বিভিন্ন নিদর্শন দেখে অভিভূত হন অ্যাম্বাসেডর।

এদিকে টুটুল জানিয়েছে, সে বাড়ি করার জন্য ইউসিবিএল ব্যাংক নারায়ণগঞ্জ শাখা থেকে ২০ লাখ টাকা লোন নিয়েছিল। তবে ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৩ মার্চ টুটুল ১০ বছর মেয়াদে ২০ টাকা লোন নেয়। কিন্তু মাত্র দেড় বছরের মাথায় ২০১৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পুরো লোন পরিশোধ করে টুটুল।

প্রশ্ন উঠে মাত্র দেড় বছরে ২০ লাখ টাকা টুটুল পেল কোথায়? এছাড়াও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফতুল্লার পিলকুনিতে ৪ শতাংশ জমি, ব্রাজিল বাড়ির সন্নিকটে আরো ৮ শতাংশ জমি কিনেছেন টুটুল। অথচ টুটুলের বেতন ২৫ হাজার ৪৬২ টাকা। এই বেতনের একজন কর্মচারী রাতারাতি এতো টাকার মালিক বনে যাওয়ার বিষয়টি আলাউদ্দিনের চেরাগের মতো লাগছে এলাকাবাসীর কাছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে টুটুলের দুর্নীতিন নথিপত্র জমা পড়ে। দুর্নীতি দমন কমিশন টুটুলকে ডেকেছিল। ওই বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
সূত্র: (সার্চলাইট)চ্যানেল২৪ নিউজ