” এক জ্যোৎস্না ভেজা রাতের গল্প “

–গোলাম কবির

এরকম জ্যোৎস্নার প্লাবন ভাসা রাত
কখনো দেখিনি আমি কোনো দিন ,
কখনো দেখেছো কি কেউ কোনো কালে
জানিনা তা। দেখলাম আমি কতো কিছুই
সে রাতে! দেখলাম কতো ভীরু হরিণীর
অগত্যায় আত্মসমর্পণ বিকৃত কামনার
শিকার হতে ক্ষুধার্ত রাক্ষুসে পশুর হাতে
কখনো নিঃসঙ্গ পার্কের ঝোঁপের আড়ালে,
কোথাও বা আলো আঁধারের লুকোচুরি খেলা
সস্তা দামের হোটেলে,
কোথাও বা কেউ সেই অসহায় হরিণীর
সব কিছু লুটপাট করে ওর মুখ থেকে
উচ্চারিত খিস্তি খেউরের মজা নিচ্ছে!
আবার দেখলাম এরই মধ্যে কেউ কেউ
ক্যাসিনোতে হেরে গিয়ে ক্লান্ত অবসন্নতায়
দামী শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে
শুয়ে শুয়ে
কতো কিছুই ভাবছে। সেই বেহায়া
জ্যোৎস্নার শিশির ভেজা রাতে দেখলাম মগবাজার মোড়ের

ডাস্টবিনে পথশিশু টোকাই
থেকে শুরু করে অসহায় বৃদ্ধ
নারী ও পুরুষের সাথে আপোষে
ফেলে দেয়া নষ্ট খাবার ভাগ করে
খাচ্ছে বেওয়ারিশ কুকুর ও বিড়ালের দল
পরম তৃপ্তিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে।
সেই জ্যোৎস্না ভেজা রাতেই দেখলাম
নেশার বিষাক্ত মরণ ছোবলে
কিভাবে লুটিয়ে পড়ছে এই শহরের এক
একটি শিশু হতে শুরু করে মধ্য বয়সী
মানুষ পর্যন্ত, বদলে যাচ্ছে ভীষণ রকম
এই শহরটা,
বদলে যাচ্ছে মানুষ গুলো!
আমি ভাবছি মনে মনে, হায়!
এই শহর কি আমার?
এখানেই কেটে গেছে আমার
জীবনের চল্লিশটা বছর!
সেই সদরঘাটের পথ ধরে নবাবপুর রোড
হয়ে জগন্নাথ কলেজে আসা যাওয়া,
ভিক্টোরিয়া পার্কে বসে বসে আড্ডা দেয়া
বন্ধুদের সাথে, সাঁতরে বুড়িগঙ্গা নদী
পার হয়ে ওপারে জিঞ্জিরায় ঘুরে আসা,
কলেজে প্রতিদিনের খরচ বাঁচিয়ে
হেঁটে হেঁটে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফেরা,
তারপর ফেব্রুয়ারি বইমেলায় শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ,আবুল হাসান, রফিক আজাদ,
আবিদ আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান,
আল মাহমুদ,
রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ –
এঁদের কাব্যের স্বাদ নিতে বই কিনে!
এখনো সব মনে পড়ে চকচকে রুপালি
কয়েনের মতো, এই যে মানিক মিয়া
এভিনিউ দেখছেন –
এখানে অনেক বড়ো বড়ো গাছ ছিলো,
এশহরের উন্নয়নের নামে গাছ গুলোর
ভীষণ হত্যা দৃশ্যও প্রত্যক্ষ করতে
হয়েছে আমাকে, আমি কষ্ট পেলেও
কিছুই বলতে পারিনি
তখন সে সময়,
যা আমাকে এখনো খুব পীড়া দেয়।
তারপর মনে পড়ে রিং রোডে –
ইট, সিমেন্ট ও বালির তৈরি বেঞ্চে বসে
বসে আড্ডার দিন গুলো, বুড়িগঙ্গা নদীকে
খুব কাছে পাওয়া, আহা!
এখন সেখানে জাপান গার্ডেন সিটি কলোনী,
কতো হাইরাইজ টাওয়ার বিল্ডিং,
এখান থেকে নদীটাই গায়েব হয়ে গেলো,
কেউ তো বলে না কিছু,
আমি শুধু কষ্ট পাই নদীর কাছে গেলে,
ওর শীর্ণতা আর দূষিত বিষাক্ত কালো জল
আঁজলা ভরে হাতে নিয়ে!