আদালতে পিন্টুর স্বীকারোক্তিঃ ৩দফায় স্বপনের খন্ডিত লাশ শীতলক্ষায় ফেলে

আইন-আদালত(আজকের নারায়নগঞ্জ): স্বপন কুমার সাহাকে হত্যায় দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন ঘাতক পিন্টু দেবনাথ। রোববার বিকালে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল মহসিনের আদালতে এ স্বীকারোক্তীমূলক জবানবন্দি দেয় পিন্টু। এসময় অপহরণ ও হত্যার পর লাশ গুম করার বিশদ বর্ণনা দেন তিনি।

স্বপনকে হত্যার পর লাশ ৭ টুকরো করে বাজারের ৫টি ব্যাগে ভরে লাশের টুকরোর উপরে সবজি রেখে তিন দফায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয় পিন্টু। এ হত্যাকান্ডের সময় তার সঙ্গী ছিল রত্না রানী চক্রবর্তী।

নিহত স্বপন কুমার সাহা নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ কাচারীগলি এলাকার মৃত সোনাতন চন্দ্র সাহার ছেলে। ঘাতক পিন্টুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল নিহত স্বপন ।

গত ১৮ জুলাই কাপড় ব্যবসায়ী স্বপন কুমার সাহাকে হত্যার অভিযোগে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে নারায়নগঞ্জ গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। পরে আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

এদিকে গত ১৯ জুলাই একই হত্যাকান্ডের ঘটনায় পিন্টু দেবনাথের পরকিয়া প্রেমিকা রত্মা রাণী চক্রবর্তী ও ঘাতক পিন্টু দেবনাথের কথিত বড় ভাই আবদুল্লাহ আল মোল্লা মামুন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন।

জবানবন্দিতে পিন্টু বলেন, ভারতের কলকাতায় একটি ফ্লাটের টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে স্বপন কুমার সাহাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর যৌন মিলনের প্রলোভন দেখিয়ে পিন্টু তার প্রেমিকা রত্না রানীকে দিয়ে শহরের মাসদাইরে রত্নার ফ্ল্যাটে স্বপনকে ডেকে নেয়।

এরপর বিছানায় বসিয়ে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করে পূর্বে থেকে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রাখা ফ্রুটিকা জুস স্বপনকে পান করায় রত্না। জুস খেয়ে স্বপন অচেতন হয়ে পড়ে। পরে পিন্টু স্বপনের মাথায় শীল পুতা দিয়ে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে বাথরুমে নিয়ে বটি দিয়ে স্বপনের দেহ সাত টুকরো করে। লাশ গুমের জন্য এরপর ৫টি বাজারের ব্যাগে ভরে স্বপনের দেহ (অংশগুলো) ভবনের পাশে খালি স্থানে রাখে পিন্টু।

পরে পিন্টু সুযোগ বুঝে ব্যাগ ভর্তি লাশের টুকরোর উপর সবজি রেখে ৩ দফায় সেন্ট্রালঘাটের দক্ষিনে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয় ।
এর আগে রত্মা আদালতকে স্বপন হত্যার একই বর্ননা দিয়ে জানান, স্বপনের লাশ গুমের জন্য স্বপনের দেহ (অংশগুলো) নদীতে ফেলতে সহায়তা করে রত্না। সে ও পিন্টু মিলেই বাড়ির নিচে ব্যাগগুলো নামায়। মাসদাইর থেকে তিন দফায় ঘাটে ব্যাগগুলো আনা হয়।

প্রথম দফায় একটি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় দুটি করে ব্যাগ কেন্দ্রীয় লঞ্চ টার্মিনালের পাশে সেন্ট্রাল খেয়া ঘাটে আনে। প্রত্যেকবার সে বৈঠা চালানো নৌকা রিজার্ভ করে বন্দর ঘাটে যাওয়ার জন্য।

পরে মাঝির অগোচরে ব্যাগগুলো ফেলে দেওয়া হয় শীতলক্ষ্যায়। আর মাসদাইর থেকে রিকশায় করে লাশবোঝাই ব্যাগগুলো যাতে কেউ বুঝতে না পারে সেজন্য উপরে দেওয়া হয় সবজি।

এর আগে গত ১৫ জুলাই রাতে ডিবি পুলিশ মাসদাইর এলাকা থেকে স্বপন অপহরণের ঘটনায় মামুন ও পিন্টুর বান্ধবি রত্না রাণী চক্রবর্তীকে স্বপনের বড় ভাই অজিত কুমার সাহার অভিযোগের সূত্র ধরে গ্রেপ্তার করেন। রত্না আটকের পর তার কাছ থেকে নিহত স্বপনের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ।

১৮ জুলাই রাতে গ্রেপ্তারকৃত রত্না রিমান্ডে থাকা পিন্টুকে নিয়ে শহরের মাসদাইরে রত্না যে বাড়িতে থাকে সেই বাড়িতে যায় ডিবি পুলিশের একটি টিম। পরে ওই ফ্ল্যাট থেকে স্বপন কুমার সাহাকে হত্যার জন্য ব্যবহৃত শিল পুতা, বটি, রক্তমাখা বিছানা চাদর ও তোষক উদ্ধার করে।

প্রসঙ্গত, গত ১৮ জুন থেকে নিখোঁজ ছিলেন নারায়ণগঞ্জের আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ। তার সন্ধান দাবিতে ২১ দিন ধরে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ী, নিহতের স্বজন, বিভিন্ন সংগঠন ও পরিবারের লোকজন মানববন্ধন ও সমাবেশ করে আসছিল।

এরই মধ্যে গত ৯ জুলাই সকালে সন্দেহ ভাজন হিসেবে শহরের কালীরবাজার এলাকা থেকে পিন্টু দেবনাথকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। এর আগে কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বাপান ভৌমিক বাবুকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্য মতে রাতেই শহরের আমলপাড়া এলাকায় একটি বাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীর ঘোষের খন্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়।

বন্ধকী স্বর্ণ ও টাকা আত্মসাত, দোকানের পজিশন হাতছাড়ার ভয় ও পুঞ্জিভুত ক্ষোভের সূত্রধরে পিন্টু দেবনাথ কালির বাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী বন্ধু প্রবীর ঘোষকে বিয়ার খাওয়ার কথা বলে তার ফ্ল্যাটে নিয়ে হত্যা করে। পরে লাশ ৭ টুকরো করে বাসার নিচতলায় সেফটিক ট্যাংকির ভেতর ও ড্রেনে ফেলে দেয়। ২১দিন পর ৯ জুলাই ও ১০ জুলাই রাতে দুই দফায় পিন্টুর তথ্যমতে ডিবি পুলিশ প্রবীরের খন্ডিত লাশ উদ্ধার করে।