বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশু ও তার মা

বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশু ও তার মা

– দিলীপ গুহঠাকুরতা

শিশু এসে মাকে বলে ‘ জানো মা কি হলো যে আজ !
টিচার আমায় ক্যান্ডি দিলেন, দেননি কোন বাড়ির কাজ ।
প্রিন্সিপ্যাল স্যার ডেকে নিলেন, লিখলেন কয়েক ছত্র,
বললেন – তোমার মায়ের কাছে লিখে দিলাম পত্র।‘

খামটি খুলে চিঠি পড়ে অশ্রুসজল মা,
রুমাল দিয়ে মুছে নিলেন দু’ চোখের কান্না।

শিশু ভয়ে মা-কে সুধায়, কপোলে তাঁর চুমি –
‘চিঠির ভাষায় কী আছে মা, কাঁদছো কেন তুমি?‘

‘এ তো কান্না নয়কো খোকা – চোখে খুশির জল,
তোর প্রতিভার শংসায় মন আনন্দে উচ্ছল।
বলছে ওরা পায়নি কভু তোর মতো চিন্ময়,
টিচার যারা আছেন সেথা, তোকে পড়াবার নয়।
বড় বড় স্কুল আছে শহরে নগরে,
তেমন কোথাও ভর্তি হলে উঠবে জীবন গড়ে।
তোকে নিয়ে করছে ওরা অনেক হিসাব নিকাশ,
উপযুক্ত শিক্ষায় তোর হবে মেধার বিকাশ।
পিতৃহীন খোকা তোকে কেমন করে বলি!
যৎসামান্য উপার্জনে কত কষ্টে চলি।
শহরে তোকে পাঠাবো যে, সে সংগতি কই!
আমিই বরং আজকে থেকে তোর শিক্ষক হই।‘

স্কুল তো নয় – সে যেন এক অসহ্য জেলখানা,
মায়ের কথায় খোকা সেদিন খুশিতে আটখানা।

শুরু হলো মায়ের কাছে শিশুর বিদ্যা শিক্ষা,
সিলেবাসের বাইরে গিয়ে প্রথম পেলো দীক্ষা।
গ্রন্থ ছাড়াও পরিবেশ আর প্রকৃতির ক্যানভাসে,
কত কিছুই আছে শেখার আকাশে বাতাসে।
অজানাকে জানার নেশা পিয়াসি অন্তরে,
না না রকম প্রশ্নে খোকা মা কে ব্যকুল করে।
নতুন কিছু শিখতে সে চায় আহার নিদ্রা ভুলে
ধীরে ধীরে যাচ্ছে খোকার জ্ঞানচক্ষু খুলে।

দিনের পরে দিন চলে যায় – খোকা বড় হয়,
ছোট ছোট আবিস্কারে ভরছে গৃহময়।
মায়ের উৎসাহ পেয়ে ভীষণ বুদ্ধি খেলে,
নতুন নতুন উদ্ভাবনে এগিয়ে যায় ছেলে –
বৈদ্যুতিক বাল্ব, মুভি ক্যামেরা, সাউন্ড রেকর্ডার,
ভ্যাকুয়াম ডায়োড, কাইনেটোফোন, ফোনোগ্রাফ সিলিন্ডার,
ভিটাস্কোপ, মাইমোগ্রাফ, কার্বন মাইক্রোফোন,
কাইনেটোস্কোপ, ইলেকট্রিক পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন।
তিনিই প্রথম করেছিলেন টেলিফোন আবিস্কার,
নীরব থাকায় গ্রাহাম বেলের নাম হলো প্রচার।
তেইশ শ’ বত্রিশ পেটেন্ট তাঁর, আমরা কি তা জানি!
এই রেকর্ড সংখ্যা ভাঙেনি আজও কোন বিজ্ঞানী।

মা- কি কারও বেঁচে থাকেন ধরায় চিরদিন,
বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীও হলেন মাতৃহীন।
ঘর পরিস্কার করতে গেলেন মায়ের প্রিয় ধামে, ,
হাতে এলো সেই চিঠিটি বিবর্ণ এক খামে।
মেলে ধরলেন পত্রখানি পরম কৌতূহলে,
চিঠির ভাষায় বিজ্ঞানীর মাথা উঠলো টলে।
এ কী কথা লিখেছিলেন সেদিন প্রিন্সিপাল !
‘বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছেলে পুরোমাত্রায় ডাল,
নির্বোধ এই ছেলের তরে স্কুলের বদনাম,
বাধ্য হয়ে আমরা তাকে বহিস্কার করলাম।‘

কোন ধন কী পারে তাঁর মেধা কিনতে !
মিশিগানের স্কুল তাঁকে পারলো না চিনতে।
মায়ের শিক্ষায় পৃথিবী করলেন পরিবর্তন,
নামটা তাঁর সবাই জানি ‘টমাস আলভা এডিসন’।

লেখক* সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ বিভাগ