হত্যার সাক্ষী না রাখতেই খুনের সাথে কাউকে সম্পৃক্ত করেনি পিন্টু

আজকের নারায়নগঞ্জঃ  প্রবীর তাঁকে নারী দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিলো এবং তাঁর পরিবারের সামনেই তাঁকে নানা ভাবে অপমান করেছিলো। এছাড়াও বিভিন্ন সময় প্রবীর তাঁর সাথে অশোভন আচরণ করতেন। মূলত এসব কারণেই প্রবীরের প্রতি  ক্ষোভ জন্মায় ঘাতক বন্ধু পিন্টু দেবনাথের । এর পাশাপাশি প্রবীরের অর্থ আত্মসাতেরও লোভ জন্মায় তাঁর ভেতর। হত্যার স্বাক্ষী না রাখার জন্যেই অন্য কাউকে সম্পৃক্ত করেনি হত্যাকান্ডে।

এভাবেই নারায়ণগঞ্জে নিষ্ঠুরতম প্রবীর ঘোষ হত্যাকাণ্ডে বিভৎস ও লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে ‘ঘাতক’ পিন্টু দেবনাথ। এসময় এই হত্যাকাণ্ডে নিজের সরাসরি জড়িত থাকার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছেন সে।

শনিবার (১৪ জুলাই) বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসানের খাস কামড়ায় পিন্টু দেবনাথের জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। এর আগে ৫দিনের রিমান্ড শেষে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ পিন্টুঁকে আদালতে হাজির করে।

বিকেল ৪টা থেকে পিন্টুর জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। প্রায় ৪ ঘণ্টা দীর্ঘসময় আদালত ‘ঘাতক’ পিন্টুর জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়।

প্রবীর হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মফিজুল ইসলাম জবানবন্দী রেকর্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের সাথে আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিং করেন।

আদালতে পিন্টু তাঁর জবানবন্দীতে দাবি করেছেন, সে রাতে প্রবীরকে তিনি একাই খুন করেন এবং খনের পর লাশ গুম করার জন্য নিজ হাতেই ৭ টুকরো করে তারমধ্যে ৫ টকুরো তিনটি বাজারের ব্যাগে ভরে সেপটিক ট্যাঙ্কে এবং অপর দুই টুকরো পার্শ্ববর্তী বাড়ির ময়লার স্তূপে ফেলা দেয়া হয়। এছাড়া হত্যায় ব্যবহৃত চাপাতি, বালিশ, বিছানার চাঁদর শীতলক্ষ্যায় ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে বলে আদালতে সে জানিয়েছে তাঁর জবানবন্দীতে।

হত্যার কারণ সম্পর্কে পিন্টু জানায়, প্রবীরের দেয়া প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকার বন্ধকী র্স্বণ, দোকান ও ক্ষোভের বশভূত হয়ে সে এই হত্যার পরিকল্পনা করেন। এবং পরিকল্পনা অনুযায়ি ১৮ জুন রাতে মোবাইলের মাধ্যমে প্রবীর ঘোষকে মাদক সেবনের কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে আসেন।

পিন্টু জানায়, তাঁর নামে যে দোকান ‘পিন্টু স্বর্ণালয়’ আছে সে দোকানে প্রবীরের দেয়া টাকা আছে। এছাড়া প্রবীর তাঁর কাছে সাড়ে ৪ লাখ টাকার স্বর্ণ বন্ধক রেখেছিলো। এসব আত্মসাতের জন্যই হত্যা করা হয়। আর এই হত্যার জন্য অনেকদিন থেকেই পরিকল্পনা করছিলো সে। এ লক্ষ্যে হত্যার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও সংগ্রহ করেন। শুধু হত্যার পরিকল্পনা নয়, হত্যা শেষে লাশ কীভাবে গুম করবে সে পরিকল্পনাও সে কষে রাখে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মফিজুল ইসলাম বলেন, হত্যার সাক্ষী না রাখার জন্যই খুনের সাথে আর কাউকে সম্পৃক্ত করেনি পিন্টু। সে রাতে প্রবীর আমলা পাড়া কে সি নাগ রোডের ঠাণ্ডা মিয়ার বাড়ির দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে আসে। এ ফ্ল্যাটে পিন্টু একাই বসবাস করে। এখানে একসাথে মাদক সেবন ও বিশ্বকাপের খেলা দেখার জন্য ডেকে নিয়ে আসে পিন্টু দেবনাথ।

তিনি জবানবন্দীর বরাত দিয়ে আরও জানান, প্রবীর ঘোষ গভীর মনযোগসহকারে টিভি দেখছিলো। এমন সময় পিন্টু চাপাতি দিয়ে প্রবীরের মাথায় ও ঘাড়ে আঘাত করে। এরপর প্রবীর বাঁচার জন্য বেশ কয়েকবার পিন্টুকে লাত্থিও মারে। কিন্তু পিন্টু তাঁর হাতে থাকা বটি দিয়ে এলোপাথারী কোপাতে থাকে প্রবীরকে। এক পর্যায়ে রক্তাক্ত প্রবীরকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা নিশ্চিত করা হয়।

মফিজুল জানান, হত্যা নিশ্চিত করার পর কিছুক্ষণ ঠাণ্ডা মাথায় বসে থেকে এরপর নিজ হাতেই চাপাতি দিয়ে প্রবীরের দেহ ৭ খণ্ড করে পিন্টু তাঁর নিজ হাতেই। সেই ৭ খণ্ডের মধ্যে তিনটি বাজারের ব্যাগে ৫ খন্ড ভরে ঠাণ্ডা মিয়ার বাড়ির সেপটিক ট্যাঙ্কে এবং অপর ২ খণ্ড পার্শ্ববর্তী বাড়ির ময়লার স্তূপে ফেলে দেয় সে। এছাড়া হত্যায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম একটি ব্যাগে ভরে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দিয়েছে বলে পিন্টু তাঁর জবানবন্দীতে জানায়।

প্রসঙ্গত, ২১ দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ৯ জুলাই প্রবীর ঘোষের ৫ খণ্ডে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। পরের দিন একই বাড়ির পার্শ্ববর্তী আরেকটি বাড়ির ময়লা আবর্জনার স্তুপ থেকে মরদেহের শেষাংশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে একটি মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে আটক করা হয় পিন্টু দেবনাথের কর্মচারী বাপন ভৌমিক ওরফে বাবুকে। বাবুর স্বীকারোক্তিতে আটক করা হয় পিন্টু দেবনাথকে। পরে পিন্টুর দেখানো মতেই নিখোঁজের ২১ দিন পর উদ্ধার করা হয় প্রবীর ঘোষের মরদেহ।