তারা কেন গুহার ভেতরে গিয়েছিল ? আটকা পড়লো কিভাবে ?

আজকের নারায়নগঞ্জঃ  গত কয়েকদিন ধরেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশ আলোচনা হচ্ছে থাই ফুটবলারদের নিয়। তারা মূল দলের ফুটবলার না হলেও এরইমধ্যে জনপ্রিয়তায় ছাড়িয়ে গেছেন থাই ফুটবলারদের। দেশটির একটি গুহায় আটকে পড়া ১২ জন কিশোর ফুটবলার এবং তাদের কোচকে বের করে আনার অভিযান শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে।

বন্যার পানিতে নিমজ্জিত গুহার যে শুকনো উঁচু জায়গাটিতে গত দু সপ্তাহ ধরে এই দলটি আশ্রয় নিয়ে আছে, তার উদ্দেশ্যে ১৮ জন অভিজ্ঞ ডুবুরি ইতিমধ্যেই রওয়ানা হয়েছে। একেকজন কিশোরকে দুজন করে ডুবুরি তাদের তত্বাবধানে বের করে আনবেন। পুরো পথ পার হতে অন্তত ছয় ঘন্টা লাগবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আটকে পড়া ১৩ জনকে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে বের করে আনা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঝুঁকির কথাও অস্বীকার করছেন না কর্তৃপক্ষ।

তারা কেন গুহার ভেতরে গিয়েছিল ?

এখনও পর্যন্ত এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। ১২ জন কিশোর ফুটবলার তাদের টিমের কোচসহ গুহার ভেতরে গিয়েছিল শনিবার, ২৩শে জুন।

বিবিসির থাই সার্ভিস বলছে, কিশোর ছেলেরা ফুটবল প্র্যাকটিস করতে সকাল দশটার দিকে ন্যাশনাল পার্কে গিয়েছিল। তারপর তাদের সহকারী কোচ একাপোল ফেসবুকে একটি লাইভ ভিডিও পোস্ট করেছিলেন সকাল ১০টা ৪২ মিনিটে।

থাম লুয়াং-খুনাম নাঙ্গনন ন্যাশনাল পার্কের একজন কর্মী দুপুর তিনটার দিকে লক্ষ্য করেন যে গুহার প্রবেশ-মুখের সামনে ১১টি সাইকেল রাখা আছে।

তখন তারা অনুসন্ধান করতে শুরু করেন। তারপর ওই কিশোরদের একজনের পিতামাতাও ন্যাশনাল পার্কের কর্মকর্তাদের জানান যে তারাও তাদের ছেলের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না।

পরদিন ২৪শে জুন শনিবার পার হয়ে রবিবার সকাল একটা থেকে তাদের খোঁজার কাজ শুরু হয়। শনিবার রাতে সেখানকার পুলিশকে বাচ্চাদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে অবহিত করার পর এই অনুসন্ধান শুরু হয়।

স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হচ্ছে, প্র্যাকটিস শেষ হয়ে যাওয়ার পর ফুটবলের দলের একজন সদস্যের জন্যে সারপ্রাইজ পার্টির আয়োজন করতে তারা গুহার ভেতরে ঢুকেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওই দলের একজন সদস্য যে বাকি বাচ্চাদের সাথে গুহার ভেতরে যায়নি, তিনি জানান যে এর আগেও তারা আরো তিনবার গুহার ভেতরে ঢুকেছিলেন। কিন্তু বৃষ্টির মওসুমে কখনো তারা গুহার ভেতরে যায় নি।

গেইম নামের এই সদস্য বলেন, “আমরা প্রত্যেকবারই প্রস্তুতি নিয়ে ভিতরে গিয়েছি। আমাদের সাথে সবসময় টর্চলাইট ছিল। ঢোকার আগে আমরা নিশ্চিত করেছি যে সবাই শারীরিকভাবে ফিট আছে। খাওয়া দাওয়া করে তারপর আমরা ভেতরে ঢুকেছি।”

গেইম বলেন, সেদিন তিনি ওই দলের সাথে গুহার ভেতরে যাননি কারণ তিনি সুস্থ বোধ করছিলেন না। “আমাদের প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেই আমরা গুহার ভেতরে যাই। আমাদের টিমের একজন সদস্যের জন্মদিন ছিল সামনে। আমার মনে হয় তারা ভেতরে একটি পার্টি করতে যাচ্ছিল,” বলেন তিনি।

পরে গুহার ভেতর থেকে পাঠানো এক চিঠিতে সহকারী কোচ একাপোল তার আত্মীয়দেরকে দুশ্চিন্তা না করতে অনুরোধ করেছেন, সহযোগিতার জন্যে তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, এবং ক্ষমা চেয়েছেন বাচ্চাদের পিতামাতার কাছে।

কীভাবে আটকা পড়লো ভেতরে?

স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হচ্ছে, ফুটবল দলটি গুহার ভেতরে ঢোকার পর থেকেই প্রচুর বৃষ্টি হতে শুরু করে। সেখানে জমে যাওয়া জঙ্গলের পানিও ঢুকে যায় গুহার ভেতরে। পানি এতো বেড়ে যায় যে এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় গুহায় প্রবেশের মুখও।

গুহার ভেতরে পানির উচ্চতা খুব দ্রুত বেড়ে গেলে কোচসহ কিশোর ফুটবলাররা ভেতরে আটকা পড়ে যান। আরো উঁচু জায়গা খুঁজতে খুঁজতে তারা চলে যান গুহার আরো গভীরে।

এই থাম লুয়াং গুহা ১০,৩১৬ মিটার লম্বা এবং থাইল্যান্ডে যতো গুহা আছে, দৈর্ঘ্যের বিচারে এটি চতুর্থ।

৭ই জুলাই স্থানীয় একটি সংবাদপত্রের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, উদ্ধারকারী গুহার উপরের পাহাড়ে এমন একটি সুড়ঙ্গ খুঁজে পেয়েছেন যা দিয়ে বাচ্চারা যেখানে আছে সেখানে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। তখন নতুন করে আশার সৃষ্টি হয় যে বাচ্চাদের হয়তো এই সুড়ঙ্গ দিয়ে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে।

গুহাটির বিষয়ে কিছু লোক-কাহিনী:

এই গুহাটি নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মুখে মুখে অনেক গল্প চালু আছে। একটি গল্পে বলা হয়েছে এর নাম কীভাবে `থাম লুয়াং- খুন নাম নাং নন` হলো? এর অর্থ হলো – “পাহাড়ের ভেতরে বিশাল এই গুহায় ঘুমিয়ে আছেন একজন নারী। এই পাহাড়েই জন্ম হয়েছে এক নদীর।”

গল্পটিতে বলা হয়েছে যে দক্ষিণ চীনের চিয়াং রুং শহরের এক রাজকন্যা একজন অশ্বারোহী পুরুষের সাথে সম্পর্কের পর গর্ভবতী হয়ে পড়েন। তারা তখন সমাজের ভয়ে ভীত হয়ে শহর থেকে পালিয়ে দক্ষিণের দিকে চলে আসেন।

যখন তারা এই পাহাড়ি এলাকায় এসে পৌঁছান তখন রাজকন্যার স্বামী তাকে বলেন সেখানে বিশ্রাম নিতে। স্বামী তখন খাবারের সন্ধানে বের হয়ে যান। তখন রাজকন্যার পিতার লোকেরা তাকে দেখতে পায় এবং তাকে হত্যা করে।

রাজকন্যা সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করে তার স্বামীর জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। তিনি যখন নিশ্চিত হন যে তার স্বামী আর ফিরে আসবে না তখন তিনি তার চুলের একটি ক্লিপ নিজের পেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দেন। তারপর তার মৃতদেহ তখন একটি পর্বতে পরিণত হয় এবং তার শরীর থেকে যে রক্ত ঝরেছিল সেটা প্রবাহিত হয়ে `নাম মায়ে সাই` নামের এক নদীর জন্ম হয়।

আরো যারা হারিয়েছিল:

স্থানীয় থাই সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুসারে, স্থানীয় বান জং গ্রামের একজন নেতা বলেছেন, ১৯৮৬ সালে এই গুহার ভেতরে একজন বিদেশি পর্যটক নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। সাতদিন নিখোঁজ থাকার পর তাকে নিরাপদে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু সেসময় কোন বন্যা ছিল না বলে তিনি জানিয়েছেন।

চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও ২০১৬ সালের অগাস্ট মাসে ওই গুহার ভেতরে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন বলে বলা হচ্ছে। তিন মাস তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় একটি পত্রিকা লিখেছে, চীনা ওই শিক্ষক ন্যাশনাল পার্কের একটি দোকানে তার সাইকেল জমা রেখে দোকানদারকে বলেছিলেন তিনি মেডিটেশন বা ধ্যান করার জন্যে গুহার ভেতরে যাচ্ছেন। তখন তার খোঁজে তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছিল। গুহার ভেতরে তাকে পাওয়া না গেলেও তিন মাস পর তাকে পাশের একটি অবকাশ কেন্দ্রে পাওয়া যায়।

সূত্র: বিবিসি