ক্যারিবীয়ান দ্বীপপুঞ্জে বেসামাল টাইগার ব্যাটসম্যান!

ক্রীড়া ডেস্ক: ক্যারিবীয়ান দ্বীপপুঞ্জে গিয়ে তাহলে ব্যাটিং ভুলেই গেল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা! প্রথম ইনিংসে ৪৩ রানে অল আউট হয়ে মনে হচ্ছিল একটা বাজে দিন! কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসেও একই পারফরম্যান্স।

অ্যান্টিগায় দ্বিতীয় ইনিংসে অধিনায়ক সাকিব যখন পঞ্চম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হলেন তখন বাংলাদেশে রান ৪৩। দিনের শেষ প্রান্তে বাংলাদেশ হারায় মেহেদী হাসান মিরাজের উইকেট। ৫০ রানেই নেই ৬ উইকেট। ‘যাচ্ছেতাই’ ব্যাটিংয়ে আবার ব্যাটিং বিপর্যয়ে বাংলাদেশ। অপেক্ষা আরেকটি ‘লজ্জা’র পরাজয়ের।

বাংলাদেশের করা ৪৩ রানের জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ করে ৪০৬ রান। ৩৬৩ রানে পিছিয়ে থেকে ব্যাটিংয়ে নেমে দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশের স্কোর ৬ উইকেটে ৬২। এখনও ৩০১ রানে পিছিয়ে সাকিবের দল।

কোনো দল যদি পরপর দুই ইনিংসে ব্যর্থ হয় তাহলে তাদের সম্পর্কে খারাপ ধারণা পাওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু খারাপ ধারণার থেকেও খারাপ পারফরম্যান্স ব্যাটসম্যানদের। ব্যাটিংয়ের স্বাভাবিক তত্ত্বগুলোও মনে হয় ভুলতে বসেছেন ব্যাটসম্যানরা! ব্যাটের সঙ্গে নেই পায়ের কোনো সংযোগ, বলের গতি ও বাউন্স বোঝার ক্ষমতা নেই, নেই থিতু হয়ে থাকার ধৈর্য্য, আত্মবিশ্বাসও তলানিতে। দূর্বল শট নির্বাচন আর মনোযোগের ঘাটতি সব মিলিয়ে পাস নম্বরও বহুদূরে। প্রায় দেড় মাসের সফর শুরু হলো এমন বিভীষিকাময় পারফরম্যান্স দিয়ে।

বাংলাদেশ যখন ব্যাট করছিল, সবুজ ঘাসের উইকেটকে মনে হচ্ছিল বোলিং বান্ধব। আবার সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল যখন ব্যাট হাতে নামল, মনে হলো পুরোপুরি ব্যাটিং বান্ধব উইকেট। বুধবার ১৫৮ রানের লিড নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২ উইকেটে করেছিল ২০১ রান।

সেঞ্চুরির অপেক্ষায় থাকা ক্রেইগ ব্রেথওয়েট বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই তিন অঙ্কে পৌঁছে যান। বাংলাদেশের বিপক্ষে ২০১৪ সালে ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন এ ব্রেথওয়েট। সেঞ্চুরির পরও ব্যাট হাতে দ্যুতি ছড়িয়ে যান ডানহাতি ব্যাটসম্যান। আগের দিন নাইট ওয়াচম্যান হিসেবে নামা দেবেন্দ্র বিশুও থিতু হয়ে ছিলেন। প্রথম এক ঘন্টায় বাংলাদেশের বোলারা কোনো প্রতিরোধও গড়তে পারেনি।

কামরুল ইসলাম রাব্বী নতুন বল হাতে নিয়ে জ্বলে উঠেন। তার সুইং ও গতিতে উইকেট হারান বিশু। কিন্তু কাজের কাজটা করেন ঠিকই। ৭৯ বলে করেন ১৯ রান। চতুর্থ উইকেটে শাই হোপকে নিয়ে দলের স্কোর বড় করেন ব্রেথওয়েট। প্রথম সেশনে দুই ব্যাটসম্যানে ভর করে আর কোনো উইকেট হারায়নি স্বাগতিক দল।

বিরতির পর স্পিনারদের লড়াইয়ে দ্রুত সাফল্য পায় বাংলাদেশ। প্রথম ওভারের চতুর্থ বলে আউট হন ব্রেথওয়েট। ১২১ রানে তাকে ফেরান সাকিব। বাঁহাতি স্পিনারের হাওয়ায় ভাসানো বলে কভারে ক্যাচ দেন ব্রেথওয়েট। মিরাজ বাম দিকে ঝাঁপিয়ে বল তালুবন্দি করেন। নতুন ব্যাটসম্যান রোস্টন চেজ আউট হন মিরাজের ঘর্ণিতে। ব্যাকফুট পাঞ্চ করতে গিয়ে বল মিস করে এলবিডব্লিউ হন ২ রান করা রোস্টন। উইকেট রক্ষক ব্যাটসম্যান শন ডরউইচ সাকিবের বলে ফরোয়ার্ড ডিফেন্স করতে গিয়ে ক্যাচ দেন সিলি পয়েন্টে। বল তার ব্যাট ছুঁয়ে পায়ে লেগে শূণ্যে লাফায়। উইকেটের ওপর গিয়ে বল তালুবন্দি করেন লিটন।

সাকিবের জোড়া সাফল্য ও মিরাজের এক উইকেটে কিছুটা ব্যাকফুটে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। নিজেদের খেলার ধরণ পাল্টে আক্রমণ ব্যাটিং বেছে নেয় তারা। তাতে সফল অধিনায়ক হোল্ডার, রোচ। দুজন দ্রুত ৩৩ করে রান তুলেন। এরপর সাজঘরে ফেরেন মিরাজের শিকার হয়ে।

তবে একপ্রান্ত আগলে ব্যাটিং করে যান হোপ। ২২ গজে নিজের স্বাভাবিক ব্যাটিং করে হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন এ মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। দলকে ৪০০ এর ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার পর সাজঘরে ফেরেন হোপ। অভিষিক্ত পেসার রাহীর বলে পুল করতে গিয়ে লং লেগে ক্যাচ দেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ শিবিরে শেষ আঘাতটিও করেন রাহী। তার উল্টো স্লোয়ার ডেলিভারীতে বড় শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ দেন শ্যানন গ্যাব্রিয়েল (৬)। অনেক ওপরে বল উঠলেও সাকিব তালুবন্দি করেন সহজেই।

দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো ব্যাটিংয়ের জন্য দরকার ছিল দৃঢ় মনোবল আর দারুণ একটি উদ্বোধনী জুটি। তা আর হলো কই। তামিম-লিটনের উদ্বোধনী জুটির বয়স মাত্র ২২ বল। পেসার গ্যাব্রিয়েলের বলে গালিতে ক্যাচ দেন তামিম। অফস্ট্যাম্পের ওপরে হাল্কা বাউন্স বলে ডিফেন্স করতে গিয়ে ক্যাচ দেন ১৩ রান করা তামিম। এক বল পর মুমিনুলও সাজঘরে। উইকেটের বাইরে থেকে বল স্কিড করে ভেতরে ঢোকে। একটু নিচু হয়ে আসা বলে ব্যাট লাগাতে পারেননি মুমিনুল।

প্রথম ইনিংসে এলোমেলো শটে সর্বোচ্চ ২৫ রান করা লিটন এবারও সেরকম কিছুর পরিকল্পনায় ছিলেন। নয়তো অফস্ট্যাম্পের অনেকটা বাইরের বল খোঁচা মারতে যাবেন কেন? নিজের বিপদ নিজে ডেকে এনে হোল্ডারের বলে ক্যাচ দেন প্রথম স্লিপে ব্রেথওয়েটের হাতে। প্রথম ইনিংসে রোচের বলে যেভাবে মুশফিক আউট হয়েছিলেন দ্বিতীয় ইনিংসেও ঠিক একইভাবে আউট হন। পার্থক্য এবার বোলার গ্যাব্রিয়েল বলে বোল্ড আউট হন। মুমিনুলের মতোই বল স্কিড করে ভেতরে ঢুকে। গতির সঙ্গে পারেননি মুশফিক। ৮ রানে শেষ তার ইনিংস।

অধিনায়ক সাকিবও প্রথম ইনিংসের মতো বাজে শট খেলে আউট। ব্যাটিংয়ে নেই কোনো দায়িত্ববোধ! নেই টিকে থাকার মানসিকতা। খোঁচা মেরে হোল্ডারের হাতে ক্যাচ দেন তৃতীয় স্লিপে মাত্র ১২ রানে। দিনের শেষ প্রান্তে মিরাজকে আউট করে বাংলাদেশ শিবিরে ষষ্ঠ ধাক্কা দেন হোল্ডার। হাল্কা মুভমেন্ট হওয়া বলে বাড়তি গতি। তাতেই যেন সবশেষ মিরাজের। ২ রানে ক্যাচ দেন উইকেটের পিছনে।

সপ্তম উইকেটে জুটি বাঁধেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও কাজী নুরুল হাসান সোহান। দিনের শেষ ওভারে মাহমুদউল্লাহ ক্যাচ দিয়েছিলেন পয়েন্টে। কিন্তু নো বলের কল্যাণে বেঁচে যান ১৫ রান করা মাহমুদউল্লাহ। তার সঙ্গে ৭ রানে অপরাজিত সোহান।

বোলাররা লড়াই করে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আটকে রাখলেও ব্যাটসম্যানরা আবারও ব্যর্থ। তাদের পারফরম্যান্সে চাপা মিরাজ ও রাহীর পারফরম্যান্স। হতশ্রী ব্যাটিংয়ে আরেকটি ‘লজ্জা’র অপেক্ষা?