ইস্ ৪৮ রানঃ রেকর্ড গড়া জয় হাতছাড়া টাইগারদের

ক্রীড়া ডেস্ক(আজকের নারায়নগঞ্জ): এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবার নেমে নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংগ্রহ ৩৩০ রান তুলেছিল বাংলাদেশ। সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে তোলা সেই রান অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টপকে গেছে টাইগাররা। করেছে আরও ৩ রান বেশি। নিজেদের রেকর্ড সংগ্রহ তুলেও অবশ্য মুখ মলিন করেই মাঠ ছাড়লেন মুশফিকুর রহিম-মাশরাফী বিন মোর্ত্তজারা। কারণ ম্যাচটা যে ৪৮ রানে হাতছাড়া হযে গেছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।

ট্রেন্ট ব্রিজে অস্ট্রেলিয়ার দেয়া ৩৮২ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য টপকাতে যেয়ে শেষ পর্যন্তই খেলেছে বাংলাদেশ। তাতে ৮ উইকেটে ৩৩৩ করেও ৪৮ রানে হারা দলের নাম টিম টাইগার্স! আগের ম্যাচেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেয়া ৩২১ রানের রেকর্ড লক্ষ্য টপকে জিতেছিল লাল-সবুজরা। এদিন সেটি পেরিয়ে যেয়েও জয় অধরা থাকল।

জবাব দিতে নেমে শুরুটা মনমতো হয়নি। মনে হবে ইস! সৌম্য যদি ওভাবে রানআউট না হতেন, যদি আরও কিছুক্ষণ উইকেটে থাকতেন, সাকিব যদি আরও কয়টা রান বেশি করে যেতেন! লিটন যদি আগের ইনিংসের পুনরাবৃত্তি করতে পারতেন! তাতে বাংলাদেশের ইনিংসটাকে এক কথায় সাজানো যেত মহাকাব্য হিসেবে। এখন সেটা আক্ষেপের গল্প।

রেকর্ড! শেষ পর্যন্ত এই শব্দটাই হয়তো চাপ হয়ে দাঁড়াল বাংলাদেশের জন্য। নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসে রেকর্ড তৃতীয় রান হজম করা ম্যাচে জিততে হলে করতে হতো অতীতে কখনোই এমন না করা কিছু। সাধ্যের শেষ পর্যন্ত লড়ে খুব কাছে না গেলেও ব্যাটিংয়ে বড় দল হয়ে ওঠার যে ধারাবাহিকতা দেখালেন মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরা। শেষ অবধি প্রাপ্তি সেটাই!

কঠিন লক্ষ্য ছিল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তো সাড়ে তিনশই টপকে জেতেনি কেউ। দেখেশুনেই শুরু, তবুও গুলিয়ে ফেললেন দুই ওপেনার তামিম ইকবাল ও সৌম্য সরকার।

তৃতীয় ওভারে মিচেল স্টার্কের বলে টানা দুই চার মেরেছিলেন সৌম্য। ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন দারুণ কিছুর। কিন্তু পরের ওভারে রানআউট হয়ে ফিরলেন বাঁহাতি ওপেনার। প্যাট কামিন্সকে মিডঅনে খেলে রানের জন্য ছুটেছিলেন তামিম ইকবাল। ননস্ট্রাইক থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন সৌম্যও। কিন্তু মাঝপথে গিয়ে সৌম্যকে ফিরিয়ে নিজেও ফিরে আসেন তামিম। দুজনের ভুল বোঝাবুঝির সময়ে অ্যারন ফিঞ্চ বল ধরে সরাসরি থ্রোতে ভেঙে দেন স্টাম্প, সৌম্য তখন ফিরতে পারেননি দাগ বরাবর।

সৌম্যের আউটের পর উইকেটে এলেন বাংলাদেশের সেরা ভরসা সাকিব আল হাসান। ধীরে এগিয়েও অস্ট্রেলিয়ার রানপাহাড় টপকানোর চ্যালেঞ্জে ভালোই জবাব দিচ্ছিলেন দুজনে। ১৮ ওভারে ১০০ পেরোয় বাংলাদেশ।

১৯তম ওভারেই এসে ভাঙলো তামিম-সাকিব জুটি। দুজনে মিলে ৭৯ রান যোগ করার পর মার্কাস স্টয়নিসের বুদ্ধিদীপ্ত স্লোয়ার অফ-কার্টারে মিড অফে ওয়ার্নারকে ক্যাচ দিয়ে থামে সাকিবের ৪১ রানের ইনিংস। ৫০*, ৭৫, ৬৪, ১২১, ১২৪* রানের পর নিজের টানা ষষ্ঠ পঞ্চাশ পেরনো ইনিংস খেলা হলো না ওয়ানডে সেরা অলরাউন্ডারের!

এরপর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তামিম। ৬৫ বলে তুলে নেন এবারের বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ফিফটিও। ধীরে এগোলেও তামিম থাকায় অন্তত ভরসা ছিলো বাংলাদেশের।

ফিফটি পাওয়ার পরই রানের গতি কিছুটা বাড়ান তামিম। কিন্তু ভয়ঙ্কর হয়ে উঠার আগেই তাকে ফিরিয়ে দেন স্টার্ক। অজি পেসারের করা ২৫তম ওভারের প্রথম বলটিকে বাইরে থেকে টানতে গিয়ে নিজেই নিজের স্টাম্প ভেঙে দেন বাঁহাতি ওপেনার। ৬ চারে ৭৪ বলে থামে তার ৬২ রানের ইনিংসটি।

তামিমের পথ ধরে পাঁচ ওভার পরে সাজঘরে ফেরেন লিটন দাস। চোখজুড়ানো সব শটে আগের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৯৪ রানে অপরাজিত ইনিংসটিকে যখন মনে করাচ্ছিলেন লিটন তখনই জাম্পার গুড লেন্থের একটি বল আঘাত হানে তার প্যাডে। আবেদনে আঙুল তুলে দেন আম্পায়ার। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি। ১৭ বলে ২০ করে শেষ লিটনের ইনিংস!

লিটন যখন ফেরেন বাংলাদেশের সংগ্রহ তখন ৪ উইকেটে ১৭৫। উইকেটে এলেন উইন্ডিজ ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সুযোগ না পাওয়া মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। পারিবারিকভাবে আত্নীয়ের সম্পর্কে জড়ানো মুশফিকের সঙ্গে উইকেটেও গড়ে তোলেন বোঝাপড়া। দুজনের মিলবন্ধনে অসম্ভব কিছুরই স্বপ্ন দেখছিলো টাইগার সমর্থকরা।

আসলেই খেলাটাকে শেষমুহুর্তে জমিয়ে দিয়েছিলেন মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ। ৯৭ বলে দুজনের ১২৭ রানের জুটি কাঁপিয়েও দিয়েছিলো অজিদের যা তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশের তৃতীয় শতরানের জুটি।

জুটিতে দুজনেই তুলেছেন ফিফটি। ৪ বলে নিজের ৩৫তম ওয়ানডে ফিফটি তুলে নেন মুশফিক। আর অ্যাডাম জাম্পাকে কাঁপিয়ে টানা দুই ছক্কায় ৪১ বলে পঞ্চাশ পান মাহমুদউল্লাহ।

তবে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়েও বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিলো ভীষণ রকম ব্যাটিং ঝড়ের। সেই ঝড় তুলতে গিয়েই নাথান কোলটার-নাইলকে ডিপ স্কোয়ার লেগে উড়িয়ে মারতে গিয়ে প্যাট কামিন্সের হাতে কাঁটা পড়ে মাহমুদউল্লাহর ৫ চার ও ৩ ছক্কায় ৫০ বলে সাজানো ৬৯ রানের ইনিংসটি।

মাহমুদউল্লাহর পরের বলেই সাব্বিরকে বোল্ড করে বাংলাদেশের অসম্ভব স্বপ্ন শেষ করে হ্যাটট্রিকের আশা জাগান কোলটার-নাইল। তবে শেষ পর্যন্ত অবশ্য মিরাজ হতে দেননি।

দলের আশা পূরণ না হওয়ায় শেষে নিজের দিকেই নজর দেন মুশফিক। তাতে পূর্ন হয় বিশ্বকাপে নিজের প্রথম শতকের স্বপ্নও। ৯৫ বলে শতক পাওয়া টাইগার-উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন ১০২ রানে। নিজের সপ্তম শতকের পথে ৯ চারের সঙ্গে এক ছক্কা ছিলো মুশফিকের ইনিংসে।

ক্যাচ মিস তো ম্যাচ মিস! এই কথার অর্থটা মর্মে মর্মে বাংলাদেশকে টের পাইয়েছেন ডেভিড ওয়ার্নার। পঞ্চম ওভারে মাশরাফীর অফস্টাম্পের বাইরের বল কাট করেন ওয়ার্নার, সেই বল বাতাসে ভেসে চলে যায় ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে দাঁড়ানো সাব্বিরের কাছে। ঝাঁপ দিলেও বল তালুবন্দি করতে ব্যর্থ হন এই বিশ্বকাপে প্রথমবার ম্যাচ খেলতে নামা সাব্বির। তাতেই ওয়ার্নের কেল্লাফতে!

সাব্বির যখন ক্যাচ ছাড়েন তখন ওয়ার্নের রান মাত্র ১০। শেষ পর্যন্ত সৌম্যের মাথার উপরের বল টেনে মারতে গিয়ে রুবেলের হাতে আউট যখন হলেন তখন অজি ব্যাটসম্যানের রান ১৬৬ আর অস্ট্রেলিয়ার ৩১৩। সাব্বিরের এক হাফ চান্সকে ফুল করতে না পারার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের জন্য কবর খুঁড়ে তবেই ফিরলেন ওয়ার্নার।

ওয়ার্নার ফেরার পর তার ফেরারি আরও বেশি গতিতে চালাতে শুরু করেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। রানআউটের বাধায় থামে ম্যাক্সি ঝড়। মাত্র ১০ বলে ৩১ রান করে খাজার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির পর রুবেলের সরাসরি থ্রোতে আউট হন ম্যাক্সওয়েল।

ওয়ার্নারের সেঞ্চুরির এক ফাঁকে নিজের ১১তম হাফসেঞ্চুরি তুলে নেন খাজা। পাঁচ ম্যাচ পর বাংলাদেশের সঙ্গে এসে ফিফটির দেখা পান বাঁহাতি এ ব্যাটসম্যান। শেষ পর্যন্ত ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে রূপ দিতে পারেননি খাজা। মুশফিকের হাতে ক্যাচ দিয়ে সৌম্যর তৃতীয় শিকার হওয়ার আগে ৮৯ রান করেন। তার ৭২ বলের ইনিংস সাজানো ১০টি চারে।

৪০-৪৭, এই সাত ওভারে ১০৪ রান তুলে চারশ’র দিকে যাচ্ছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু এই সময়ে দ্রুত চার উইকেট তুলে নেয়ায় সেটা আর হয়নি। ম্যাক্সওয়েলের পর দুই বল খেলে ফেরেন স্টিভেন স্মিথও (১)।

প্রথম পাঁচ ম্যাচে সাত উইকেট পেয়েছেন মোস্তাফিজ। কিন্তু ইনিংসের ৩০ ওভার শেষ হওয়ার আগে একটিও উইকেট নিতে পারেননি। এই ম্যাচেও তাই। ইনিংসের ৪৭তম ওভারে পান উইকেটের দেখা। তার স্লোয়ার বুঝতে না পেরে এলবিডব্লিউ হন স্মিথ। শেষদিকে মার্কাস স্টয়নিস ১১ বলে ১৭ এবং অ্যালেক্স ক্যারির ১১ রানে ৫ উইকেটে ৩৮১ রান দাঁড়ায় অস্ট্রেলিয়ার।