কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ওলট-পালট জাপানের স্বপ্ন

ক্রীড়া ডেস্ক: টোকিওতে উৎসবের অপেক্ষায় ছিল জাপানিরা। ৭৮৪২ কিলোমিটার দূরে রাশিয়ার রোষ্টভ অন-ডনে নিজ দেশের ফুটবলারদের খেলা দেখতে আসা জাপানিরাও উৎসবের অপেক্ষায় ছিল।

কিন্তু মাত্র কয়েকটা সেকেন্ডের ব্যবধানে সব ওলট-পালট হয়ে গেল তাঁদের। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ মঞ্চে কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন দেখছিল জাপান। সব কিছু তাদের পক্ষেই যাচ্ছিল। নির্ধারিত সময়ের লড়াই ২-২ গোলে ড্র ছিল। ম্যাচ যেত অতিরিক্ত সময়ে। পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা থাকলে শেষ হাসিটা হাসতেও পারত তারা। কিন্তু বিধাতা তাদেরকে সেই উৎসব থেকে বঞ্চিত করলেন বেলজিয়ামকে শেষ মুহূর্তের গোল উপহার দিয়ে!

২-২ গোলে সমতা নিয়ে বেলজিয়াম ও জাপানের ৯০ মিনিটের লড়াই শেষ হয়েছিল। ৪ মিনিট অতিরিক্ত সময় দেন রেফারি। ৯৩ মিনিটে ৩৫ গজ দূর থেকে ফ্রি কিক পায় জাপান। হোন্ডার কিক কোনো রকমে বাঁচিয়ে বেলজিয়ামকে গোল হজমের থেকে বাঁচান গোল রক্ষক কৌতরিস। কর্ণার কিক পায় জাপান। ৪ মিনিট হতে তখন মাত্র কয়েক সেকেন্ড বাকি।

কর্ণার কিক লাফিয়ে তালুবন্দি করেন কৌতিরিস। ডি বক্সের ভেতর থেকে আন্ডারআর্ম পাস দেন কেভিন ডি ব্রুনকে। বল নিয়ে দৌড় দেন ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলা এ মিড ফিল্ডার। মাঝ মাঠ পেরিয়ে ডানদিকে পাস দেন থমাস ম্যানুয়েরকে। ম্যানুয়ের বল পেয়ে ক্রস করেন সেকেন্ড ব্যবধানে। ততক্ষণে গোল পোস্টের কাছাকাছি লুকাকু ও নাসের সাডলি। নাসেরকে সাড়া দিয়ে বল ছেড়ে দেন লুকাকু। বাম পায়ে শট নিয়ে বল জাপানের জালে পাঠান নাসের। গোল! অবিশ্বাস্য, অসাধারণ, অকল্পনীয়। কাউন্টার অ্যাটাকে মাত্র তিন পাসে এমন গোল কি ফুটবল বিশ্ব এর আগে দেখেছে? দেখলেও এতো পরিকল্পিত আক্রমণ নিশ্চয়ই ছিল না।

অন্তিম মুহূর্তের এই গোলে সব শেষ হয় জাপানের। ২ গোলে পিছিয়ে থেকে ৩-২ গোলে জয় নিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়াম। শেষ আটের লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ ব্রাজিল।

এশিয়ার একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে জাপানই টিকে ছিল রাশিয়ায়। বাকি চার দল বাড়ি ফিরেছে খালি হাতে। তাই আজ জাপানের সমর্থণে ছিল গোটা এশিয়া। হতাশ করেনি তারা। আন্ডারডগ হিসেবে খেলে প্রথমার্ধে ভয় ধরিয়ে দেয় বেলজিয়াম শিবিরে। একের পর এক আক্রমণে বেলজিয়ামের রক্ষণ ভাগ ছিল বিচলিত। প্রথমার্ধে কোনো গোল না হলেও দ্বিতীয়ার্ধে ভালো খেলার পুরস্কার পায় জাপান।

৪৮ মিনিটে মাঝ মাঠ থেকে বল পান জাপানের সিবাসাকি। বল নিজের কাছে না রেখে পাস দেন হারাগুচিকে। বলের লাইনে ছুটে গিয়ে ডান পায়ে শট নিয়ে লক্ষ্যভেদ করেন হারাগুচি। লিড জাপানের। পরের মিনিটে বেলজিয়ামকে সমতায় ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন অধিনায়ক হেজার্ড। কিন্তু তার ডানপায়ে নেওয়া শট ফিরে আসে বারপোস্টে লেগে।

পিছিয়ে পড়ার ধাক্কা কাটিয়ে না উঠতে উঠতেই ৫৩ মিনিটে আবার গোল হজম করে বেলজিয়াম। ডি বক্সের বাইরে থেকে তাকাসি ইনুয়ের হাওয়ায় ভাসানো বল খুঁজে পায় বেলজিয়ামের জাল। গোল রক্ষক চেষ্টা করেছিলেন বল থামাতে। কিন্তু পারেননি।

২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে খানিক ক্ষণের জন্য এলোমেলো হয়ে যায় বেলজিয়াম। একাধিক খেলোয়াড় বদলি করেন কোচ রবের্তো মার্তিনেজ। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ফেলাইনি মাঠে নামার পর চিত্র পাল্টে যায় বেলজিয়ামের।

শুরুটা অবশ্য শুরু থেকে খেলা ভার্টোনেনকে দিয়ে। ৬৯ মিনিটে ডি বক্সের ভেতরে জটলার মধ্যে বল পেয়ে ব্যবধান কমান এ ডিফেন্ডার। ৭৪ মিনিটে পরিকল্পিত আক্রমণে সমতায় ফেরে বেলজিয়াম। হাজার্ডের নেওয়া কর্ণার কিক থেকে বল ফেরত দিয়েছিল জাপান। কিন্তু ডানপাশ থেকে কোনাকুনি ক্রসে গোল হজম করে জাপান। হেজার্ডের ক্রস থেকে হেড দিয়ে গোল করেন ফেলাইনি। ৬৫ মিনিটে মাঠে নেমে ৯ মিনিটে গোল করেন ফেলাইনি।

আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে চলতে থাকে ম্যাচ। শেষ মুহূর্তে যে নাটক অপেক্ষা করছিল তা কারোই ধারণাতে ছিল না। শেষ নাটকে জাপান বাদ পড়ল বিশ্বকাপ থেকে। এর আগে ২০০২ ও ২০১৪ আসরে গ্রুপ পর্ব পেরিয়েছিল এশিয়ার দেশটি। এবার রাশিয়ায় গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে শেষ আটের লড়াইয়েও দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বীতা গড়েছিল জাপান। অঘটনের সম্ভবনা জাগিয়েছিল। কিন্তু এবারও শেষ ষোলোতেই আটকে গেল জাপান। ধ্রুপদী ফুটবল উপহার দিলেও শেষটা রাঙানো হলো না তাদের।