ভুল শোধরানোর সুযোগ নেই যেখানে নেইমারদের

 

আনিসুজ্জামান অনুঃ হারানোর পথে  ফুটবল বিশ্বকাপের  জৌলুস  ধরে রাখতে পারবেন কি সবেধন নীলমনি নেইমার।   কারন তার সতীর্থ  মেসি-রোনালদোরা ইতোমধ্যে বিদায় নিয়েছে সমর্থকদের কাদিয়ে। ফলে নেইমারের ব্রাজিলই এখন শেষ ভরসা বাংলাদেশের ফুটবল পাগল ভক্তদের।  তার জন্যে অপেক্ষা করতে হচ্ছে রাত ৮টা পর্যন্ত।

শুরু থেকেই অন্য মেজাজে রাশিয়া বিশ্বকাপ। ফুটবলের এ মহাযজ্ঞে সবকিছুই যেন ওলটপালট। প্রথম পর্বে পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়েছে একের পর এক ঘটনা। বড় দলগুলোকে নিয়ে রীতিমত ছেলেখেলায় মেতেছিল ছোট দলগুলো। এশিয়ার প্রতিনিধি দক্ষিণ কোরিয়ার মতো পুঁচকে দেশও বিশ্বকাপের অভিজাত দল জার্মানিকে বিদায় করে দিয়েছে। যদিও নিজেরা সে গনি্োডেিপারেনি।
এরপর নকআউট পর্ব তো আরোও দুর্বোধ্য। প্রথম দিনেই দুই মহানায়কের মহাপতন। বর্তমান বিশ্বের সেরা দুই ফুটবলার মেসি ও রোনালদো বিদায় নেওয়ার পর আজ মাঠে নামছেন ব্রাজিল ওয়ান্ডার বয় নেইমার। শেষ ষোলোয় আজ মুখোমুখি দুই লাতিন পরাশক্তি মেক্সিকো ও ব্রাজিল। সাম্বার ছন্দ আর নৃত্যে এগিয়ে চলবে বিশ্বকাপ, নাকি মেক্সিকো ওয়েভে হারিয়ে যাবে নীল হলুদের জার্সিরা। আজ দিনের প্রথম ম্যাচশেষে জানা যাবে রাশিয়ায় ওয়ান্ডার বয় নেইমার থাকবেন, নাকি মেসি রোনালদোর দেখা পথেই হারিয়ে যাবেন বিশ্বকাপ থেকে। দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী বেলজিয়ামের মোকাবেলা করবে রাশিয়ায় এখনো টিকে থাকা এশিয়ার একমাত্র প্রতিনিধি জাপান।
হেক্সা মিশনে রাশিয়ায় পা রাখা ব্রাজিলের শুরুটা এবার খুব একটা ভালো হয়নি। প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে ১–১ ব্যবধানে আটকে পড়তে হয় তাদের। দ্বিতীয় ম্যাচে কোস্টারিকার বিপক্ষে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলের দেখা পায়নি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে ম্যাচের ইনজুরি সময়ে ফিলিপ কুতিনহো ও নেইমারের গোলে জয় পায় সেলেসাওরা। তৃতীয় ম্যাচে সার্বিয়াকে সমান ব্যবধানে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয়েই শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে ব্রাজিল। অন্যদিকে গ্রুপ পর্বে জার্মানির মতো পরাশক্তিকে হারিয়ে দ্বিতীয় পর্বে উঠেছে মেক্সিকো। আজ কোয়ার্টারে উঠার ম্যাচে পরিসংখ্যানও কথা বলছে সেলেকাওদের হয়ে। এর আগে ব্রাজিল এবং মেক্সিকো মুখোমুখি হয়েছে মোট ৪০ বার। যাতে ব্রাজিলের জয় ২০, মেক্সিকোর জয় ১০ আর ড্র হয়েছে ৭টি ম্যাচ। তবে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ব্রাজিলকে কখানো হারাতে পারেনি মেক্সিকো। মোট ৪ ম্যাচের তিনটিতেই জয় পেয়েছে ব্রাজিল এবং সর্বশেষ ২০১৪ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ড্র করে দু’দল। ব্রাজিল এবং মেক্সিকোর সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ২০১৫ সালে এক ফ্রেন্ডলি ম্যাচে। সেই ম্যাচেও ২–০ গোলের জয়ের সুখস্মৃতি আছে ব্রাজিলের। তবে মাঠের খেলায় যে দল ভালো খেলবে তারাই জিতবে। শক্তিশালী দল নিয়েই রাশিয়া এসেছে ব্রাজিল। এলিসন বেকার থেকে জেসুস, মার্সেলো কাউকেই ছোট করে দেখার জো নেই।
এই টিমকে ধরা হচ্ছে ২০০২ এর গোল্ডেন জেনারেশনের উত্তরসূরি হিসেবে। তার সাথে প্রফেসর তিতের অভিনব ট্যাকটিকস বিশেষ মাত্রা দিয়েছে রোনালদো পেলের উত্তরসূরিদের। ব্রাজিলও হেক্সার স্বপ্ন দেখছে এদের পায়েই।
অন্যদিকে মেক্সিকো দলে আছে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলকিপার অচোয়া। সাথে কাউন্টার এটাকের বিশেষ ক্ষমতা অনন্য করে তুলেছে লাতিন আমেরিকার এ দেশটিকে। তাই বিশ্বকাপে আরো একটি রোমাঞ্চকর ম্যাচ দেখতে পারে সমর্থকরা। আগুন–ম্যাচের আগে ব্রাজিলের জন্য সুসংবাদ ইনজুরি কাটিয়ে খেলায় ফিরতে প্রস্তুত সেলেকাওদের দুই তারকা ডিফেন্ডার দানিয়েল ও মার্সেলো। বড় ম্যাচের আগে সেরে উঠেছেন দানিয়েল। শুক্রবার দলের সঙ্গে অনুশীলনও করেছেন ম্যানচেস্টার সিটির এ রাইট–ব্যাক। অন্যদিকে মার্সেলো শুক্রবার দলের সঙ্গে পুরোপুরি অনুশীলন না করলেও অনেকটাই সেরে উঠেছেন তিনি। মেক্সিকোর বিপক্ষে মার্সেলো খেলতে পারবেন বলে আশাবাদী ব্রাজিল কোচ তিতে। মেক্সিকোর বিপক্ষে ব্রাজিলকে ফেবারিট মানতে নারাজ দলের মিডফিল্ডার ক্যাসিমিরো। তিনি বলেন, ম্যাচ জিততে হবে মাঠে খেলেই। দলকে সাবধান করলেও জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী এই মিডফিল্ডার। ম্যাচটি নিয়ে ক্যাসিমিরো বলেন, ‘আমরা ম্যাচটি নিয়ে নিশ্চিন্তে আছি। আমাদের দলে অনেক উচ্চমানের খেলোয়াড় আছে। আমরা প্রতিপক্ষকে সম্মান করি। আমাদের মেক্সিকোর বিপক্ষে খেলেই জিততে হবে।’
অন্যদিকে সেলেকাওদের বিপক্ষে নিজেদের প্রত্যাশাকে প্রাপ্তিতে রূপ দেবার স্বপ্নে বিভোর মেক্সিকানরা। জয় ভিন্ন অন্য কোনো কিছুই ভাবছে না পুরো দল।
আত্মবিশ্বাসী মেক্সিকান অধিনায়ক গুয়ারদ্রাদো বলেন, ‘আমরা যদি জিততে পারি তবে সবকিছুই আমাদের পক্ষে আসবে। আমরা যদি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ ষোলতে সুইজারল্যান্ডের মোকাবেলা করতাম বিষয়টা অন্যরকম হতো। সুইসদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তাদেরকে হারালে মানুষ ততটা উচ্ছ্বসিত হতো না, যতটা ব্রাজিলকে হারালে হবে। সে কারণেই ব্রাজিলের বিপক্ষে একেবারে সঠিক সময়ে আমরা মাঠে নামছি। তারা ৫ বারের চ্যাম্পিয়ন, ম্যাচটা দারুণ উপভোগ্য হবে। ফুটবল আমাদের সামনে যে সুযোগ এনে দিয়েছে তা নিয়ে আমরা দারুণ উত্তেজিত। এর থেকে ভালো সুযোগ আর হতে পারে না।’
দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে মাঠে নামছে সাম্প্রতিক সময়ে ফুটবলের অন্যতম আলোচিত শক্তি বেলজিয়াম আর এশিয়ান পাওয়ার হাউজ জাপান। গত কয়েক বছর ধরেই বেলজিয়াম খেলছে দারুণ ফুটবল। একই সাথে একই সময়ে আচমকাই তাদের ফুটবল পেয়ে গেছে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়, যাদের বলা হচ্ছে সেই দেশের ফুটবলের গোল্ডেন জেনারেশন। মাঝে একটা সময় তারা দখলে রেখেছিল ফিফা র‌্যাংকিংয়ের এক নম্বর স্থানটাও। এই মুহূর্তেও তারা আছে র‌্যাংকিংয়ের তিনে। ফলে তাদেরকে বিশ্বের সেরা তিন দলের একটির মর্যাদা দিলেও বুঝি ভুল হবে না। যদিও এখন পর্যন্ত বেলজিয়ামের এই দলটি জিততে পারেনি কোনো শিরোপা। গত বিশ্বকাপেও তারা কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নিয়েছিল আর্জেন্টিনার কাছে হেরে।
এবারে রাশিয়া বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পথে বেলজিয়ামের সামনে এখন বাধা জাপান। এই ম্যাচে নিশ্চিতভাবেই ফেভারিট ইউরোপের রেড ডেভিলরা। কেভিন ডি ব্রুইন, ইডেন হ্যাজার্ড, রুমেলু লুকাকু, থমাস ভার্মুলেন আর গোলরক্ষক কর্টইসকে নিয়ে দারুণ শক্তিশালী দল বেলজিয়াম। রুমেলু লুকাকু গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে করেছেন চার গোল। গোল্ডেন–বুটের দৌড়ে থাকা এই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফরোয়ার্ড জাপানের বিপক্ষে নিজের স্বপ্ন–পূরণে আরেকবার জ্বলে উঠতে চাইবেন কোনো সন্দেহ নেই।
অন্যদিকে রাশিয়ায় জাপান দেখাচ্ছে তাদের সেরা প্রদর্শনী। গ্রুপের শেষ ম্যাচে পোল্যান্ডের কাছে নূন্যতম ব্যবধানে হারলেও শুরুতে শক্তিশালী কলম্বিয়া দলকে হারিয়েছে ব্লু সামুরাইরা। দ্বিতীয় ম্যাচে ড্র করেছে আফ্রিকার সেনেগালের বিপক্ষে। নিজেদের ইতিহাসে তৃতীয়বারের মত উঠে এসেছে নক–আউট পর্বে। যদিও আগে কখনও সেরা ষোল পার হয়নি জাপান, কিন্তু এবার বেলজিয়ামকে হারিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয়ে জাপান।
জাপানের কোচ আকিরা নিশিনো জানিয়েছেন, ‘প্রতিপক্ষ হিসেবে বেলজিয়ামকে সমীহ করতেই হবে। কিন্তু তার মানে এই না যে, আমাদের ক্ষমতা নেই তাদের হারাবার। আমরা এবারেই কলম্বিয়ার মত দলকে হারিয়েছি। আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে বেলজিয়ামকে হারাবার।’ এবারের বিশ্বকাপে জাপানের হয়ে দারুণ খেল্ছেযেন স্প্যানিশ দল এইবারের মিডফিল্ডার শিনঝি কাগাওয়া আর অভিজ্ঞ কেইসুকি হোন্ডা। বেলজিয়ামের বিপক্ষে জাপানের অসাধারণ কিছু করতে হলে এই দুইজনকেই নিতে হবে প্রধান দায়িত্ব। গত নভেম্বরে এক প্রীতি ম্যাচে জাপানকে রুমেলু লুকাকুর একমাত্র গোলে হারিয়েছিল বেলজিয়াম।
গত ২২ ম্যাচ অপরাজিত থাকার পর ইংল্যান্ডের কাছে হারা বেলজিয়ামের কোচ রবার্ট মার্টিনেজ জানিয়েছেন, ‘বিশ্বকাপে কোন প্রতিপক্ষই সহজ নয়। জাপানের বিপক্ষেও আমাদের ফেভারিট ভাবার কোন কারণ নেই। এখানে একটি ভুলে অনেক বড় সর্বনাশ হতে পারে। এখন থেকে ভুল করার কোন উপায় নেই। কারণ এখানে সেই ভুল শোধরাবার কোনো দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়া যাবে না।’