আমিনুল ইসলাম : প্রত্ন-ঐতিহ্যের কবি

– রফিক সুলায়মান

আমিনুল ইসলামের কবিতা প্রসঙ্গে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় যে এইসব দিগন্তপ্লাবী আকাশ ও সঘন মেঘের কাঁপন, এইসব স্মৃতিময় গ্রাম ও জমির আইল, এইসব শস্যক্ষেতের সোনালি বিস্তার, এইসব মধুর মধুর সুরলিপি ও অতীতের ইশ্তেহার, এইসব লোকায়ত সভ্যতার কিরণ, এইসব প্রত্নসম্পদ ও ঐশ্বর্যময় নির্মাণরাজী, এইসব স্মৃতি ঝলমল প্রোজ্জ্বল সাংস্কৃতিক বাতাবরণ তার কবিতাকে গীতল বলিষ্ঠতা দান করেছে। যাপিত জীবন ও অভিজ্ঞতার সংরচনা তাঁকে পরিণত করেছে একজন শুদ্ধতম কবিতা-পথিকে। তার কবিতা পাঠ করা এক জীবনের আনন্দ-অভিজ্ঞতা।

আমি যে বিষয়টি নিয়ে লিখবো বলে কলম ধরেছি, তা হলো কবি আমিনুল ইসলাম কোন ক্ষমতাবলে প্রত্ন-ঐতিহ্যের কবি, এই পরম ও চরম সত্যটিকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। বর্তমান প্রেক্ষিতে এ দেশের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে যারা সামান্যতম সচেতন তারা একটি বিষয়ে দারুণভাবে বিস্ময় আর হতাশা বোধ করেন। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের কাছেও এ দেশের ঐতিহ্য গৌরবের গভীরতা স্পষ্ট নয়। পাঁচ শতকের পর ইউরোপে সামন্ততান্ত্রিক জীবনে গ্রামীণ জীবনব্যবস্থায় যখন মানুষ বন্দি, তার বহু আগে অর্থাৎ আট থেকে ছয় খ্রিস্টপূর্বাব্দে গঙ্গা অববাহিকা অঞ্চলে দ্বিতীয় নগরায়ণ শুরু হয়ে গেছে। এ পর্বে চার থেকে তিন শতকে নগর সভ্যতার বিকাশ ঘটে বাংলাদেশে। বগুড়ার মহাস্থানগড়, নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নস্থল সে গৌরব বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইউরোপে ৯ থেকে ১০ শতকে একটু একটু করে শিক্ষার আলো জ্বলে গির্জাগুলোতে। পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে এগারো থেকে বারো শতক লেগে যায়। অপরদিকে বাংলায় আট শতকের মধ্যেই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। আমাদের পূর্বপুরুষের এই উজ্জ্বল কৃতিত্ব জেনে নতুন করে বর্তমান প্রজন্মকে আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার জন্য তাদের নিয়ে যেতে হয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভাণ্ডার প্রত্নগুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে। স্বপ্ন দেখেছিলেন অতীতের গুরুত্বপূর্ণ সকল কবি। আমিনুল ইসলামও সরব। তার ‘কিউপিডের মিউজিয়াম’, ‘বটের গোড়ায় বসে আছে উৎসব’, ‘বিচূর্ণ জলের আয়নায় ভেসে ওঠা মুখ’, ‘বাঁশী’ ইত্যাদি কবিতায় বৈশ্বিক এবং দৈশিক উচ্চারণ দেখতে পাই আমরা।

‘বিচূর্ণ জলের আয়নায় ভেসে ওঠা মুখ’ কবিতাটি আমিনুল ইসলামের শ্রেষ্ঠতম রচনার একটি। শুরুতেই দুটি নদীর কথা এসেছে, তিতাস ও মহানন্দা; একটি আল মাহমুদের নদী অন্যটি আমিনুল ইসলামের নিঃসন্দেহে। ‘‘তিতাস থেকে মহানন্দা – জলের হাহাকার তুলে দরবারী সঙ্গীতের মতো হারিয়ে যায় নৌকা, হারিয়ে যায় জলের তাওয়ায় সেঁকা কালো কালো অজস্র মুখের মিছিল।’’’ [ বিচূর্ণ জলের আয়নায় ভেসে ওঠা মুখ/ জোছনার রাত বেদনার বেহালা] কবিতাটির অন্য একটি চরণ: ‘‘প্রত্নদহলিজে বসে আজো আমি দেখে নিই পূর্বপুরুষের সেই সাদাকালো স্বপ্নের কাফেলা।’’ মনে হয় এই চরণের মাধ্যমে অগ্রজ কবি আধুনিক বাংলা কবিতার পুরোধা-পুরুষ আল মাহমুদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন তিনি। দুটো ভিন্ন স্বভাবের নদীকে এক কবিতায় স্থান দিয়েছেন, নির্মাণ করতে চেয়েছেন উত্তরের জনপদের সঙ্গে ভাটি বাংলার সেতু। এখানেই সমগ্র সৌন্দর্য। একালের ডিজিটাল যাপিত জীবনেও আল মাহমুদ কতোটা প্রাসঙ্গিক, আমিনুল ইসলাম পাঠকের চোখে আঙ্গুল দিয়ে সেটি দেখিয়ে দিয়েছেন। কবির প্রত্নৈতিহ্য সংশ্লিষ্ট চরণগুলো আমাকে বারবার টানে। রিরিডিং এ যেতে হয় ক্ষণে ক্ষণে। ‘বাঁশী’ কবিতাটির কথাই ধরা যাক। এই কবিতায় স্বদেশ, স্বকাল, আন্তর্জাতিকতা এসেছে; এসেছে জটিল হাহাকার এবং মানবিক দীর্ঘশ্বাস। মহৎ কবিতার সকল বৈশিষ্ট্য কবিতাটিতে বিদ্যমান। গীতল চরণ, বাঁশীর সুরের মতো ঐন্দ্রজালিক মুগ্ধতার পরশ, সবখানে। মাগন ঠাকুর, আলাওল, লালন সাঁইজীর কথা এসেছে, এসেছে সাম্রাজ্যবাদীদের হিংস্রতার কথা। [বাঁশি/ শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ] তিনি নিপুণভাবে এক সময়ের সাথে অন্য সময়ের মালা গাঁথতে জানেন। সফল এবং মহান কবিরাই এটা নিপুণভাবে করতে পারেন।
[চলবে]