চালক নাকি ডাকাত! লুণ্ঠিত মালের বন্টনে লাশের পর লাশ ?

আজকের নারায়নগঞ্জ ডেস্কঃ তাহলে কি ইতিপূর্বে উদ্ধারকৃত ডাকাত আবুল হোসেনের সঙ্গী ছিল আড়াইহাজারে ‘ফোর মার্ডারে’ নিহতবাস চালক ফারুক ও অপর ৩ যুবক। এরাও কি বাসচালকের আড়ালে ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধচক্রের সদস্য। আর ডাকাতির মালামাল ভাগাভাগি নিয়েই কি এই নির্মম হত্যাকান্ড ? তাহলে কি ফারুকের স্ত্রী তাসলিমা বেগমের বক্তব্য কি সাজানো নাটক ? উদ্ধারকৃত নোয়া গাড়ীর মালিক কে? এ সকল প্রশ্নেই ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষ। দুটি প্রথম শ্রেনীর পত্রিকায় এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের ভাষাও মেলাতে চেষ্টা করছেন সাধারন মানুষ।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ফারুক জহিরুল, খায়রুল, লুৎফর নামে ৪ জনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের ৩জনের বাড়ি পাবনা জেলায়।লুৎফর মোল্লার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে । লাশগুলো ছিল যেখানে, সেখান থেকে একটি শুটারগান ও একটি মাইক্রোবাসও উদ্ধার করা হয়। এদেরকে মারা হয়েছে মাথায় গুলি করে ও থেতলে।

একই দিনে রাজধানীর দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে আরো দুই যুবকের এবং রূপগঞ্জ এশিয়ান হাইওয়ের কুশাব জামে মসজিদের পাশ থেকে আরো এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

তবে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে ৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে নিহতদের স্বজনরা যে অভিযোগ তুলছেন তার সঙ্গে বাস্তবতা মেলাতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। ২ জন হতদরিদ্র বেকারি শ্রমিক, বাস ও মাইক্রোবাসের চালককে পুলিশ যে হত্যা করবে তার পেছনে ‘প্রফেশনাল’ বা ‘পারসোনাল’ কারণ কী থাকতে পারে? তারও জবাব খুঁজে ফিরছেন অভিজ্ঞ মহল।
তবে এরা যে অপরাধচক্রের সাথে জড়িত কিছু কিছু এ রকম তথ্য বেরিয়ে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতি ও ডাকাতি চেষ্টার অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে। বিশেষ করে বাসচালক ফারুক পুলিশের কাছে ‘সব স্বীকার করেছেন’ মর্মে তার স্ত্রী তাসলিমা বেগম গণমাধ্যমে যে কথা বলেছেন তাতে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

নিহত লুৎফর মোল্লারা স্ত্রী রেশমা আক্তার  বলেন, তার স্বামী বাস চালক। শুক্রবার বিকাল ৫টার দিকে বাসা থেকে বের হন। এবং সন্ধ্যা ৭টার দিকে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামেন। রাত ১টায় স্বামীর সাথে তার শেষ বারের মতো কথা হয়। এরপর থেকে স্বামীর মোবাইল ফোন বন্ধ পান। রোববার সকালে টেলিভিশনে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ৪ জনের লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে নারায়ণগঞ্জ হাসপাতাল মর্গে ছুটে আসেন তিনি।

লুৎফরের স্ত্রী আরো জানান, লুৎফর রাজধানীর রামপুরা থানার বাগিচারটেক এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থাকত। লুৎফর মোল্লার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার উত্তর আকনবাড়িয়া কালীবাড়ি এলাকায়। তাঁর পিতার নাম মুনসুর মোল্লা।

অপর দিকে নিহত জহিরুলের শ্বশুর লাশ শনাক্ত করতে এসে গত ২২ অক্টোবর বলেছেন, ‘বাসচালক হলেও ফারুকের অবৈধ ব্যবসা ছিল। সে ছিনতাই চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিল। সে নিজের শক্তি বাড়াতে ওই ছেলেগুলোকে (লিটন, সবুজ ও জহিরুল) নিজের কাছে নিয়ে এসে বিপথগামী বানিয়েছে। তারা একে অপরের আত্মীয় ছিল। ফারুক নিয়মিত বাস চালাত না। অথচ সে তিন বেলাই তিন রকমের দামি শার্টপ্যান্ট পরত যা দেখে অনেকেই সন্দেহ করত।’ এমন বক্তব্য নিয়েও চলছে নানা সমীকরণ।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘জানা গেছে, গত ২০ অক্টোবর রূপগঞ্জের গোলাকান্দাইল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত শীর্ষ ডাকাত সর্দার আবুল হোসেনের সঙ্গে নিহত ফারুকের সখ্য ছিল অনেক বছর ধরে। সূত্র বলছে, নিহত ২ জনই ছিলেন পেশায় বাসচালক এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কয়েক মাস আগে এই বন্ধুত্বে ফাটল ধরে। আবুলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, একটি রডের ট্রাক ডাকাতির টাকার ভাগাভাগি নিয়ে আবুলের সঙ্গে ফারুকের বিরোধ দেখা দেয়। এরপর ফারুক স্থানীয় কয়েকজন যুবককে নিয়ে নিজের দল ভারী করে এবং মাসখানেক আগে তার দেশের বাড়ি থেকে কিছু ছেলেকে নিয়ে আসে।
২০ অক্টোবরের ঘটনা সম্পর্কে ওই সূত্র জানান, আমি শুনেছি ওই এলাকায় একটি ছিনতাইয়ের মালামাল নিয়ে আবুল ও ফারুক বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। আবুল ওই সময় ফারুককে তার দল থেকে বের করে দেয় এবং মারধর করলে দুজনের অনুসারীদের মধ্যে গোলাগুলি হয়ে আবুল মারা যায়। আবুলের সঙ্গীরা এরপর থেকেই ফারুকও তার সঙ্গীদের খুঁজছিল।
এদিকে ফারুকের কর্মস্থল রূপগঞ্জের ভুলতা বাসস্ট্যান্ডে গেলে এই প্রতিবেদক পেয়ে যান আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ফারুক ছিলেন অনিয়মিত বাসচালক। সব সময় দামি ব্র্যান্ডের মোবাইল ব্যবহার করতেন। প্রায় রাতেই নিজের ভাগ্নে সবুজ ও জহিরুলকে সঙ্গে নিয়ে দামি প্রাইভেট গাড়িতে চেপে বেরিয়ে পড়তেন। আর বাস মালিকরা বলছেন, ফারুক খুব একটা বাস না চালালেও গ্রামের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিলেন বেকার ও গরিব ভাগ্নে আর জ্ঞাতি ভাইদের। ওদের রাখতেন নিজের বাসাতেই। তাদের ভরণপোষণও বহন করতেন ফারুক। ফারুকের এই বিলাসিতা দেখে প্রশ্ন জাগত তার টাকার উৎস কোথায়?
জানা গেছে, নিহত ডাকাত সর্দার আবুলও পেশায় ছিলেন বাসচালক। তার বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানাসহ জেলার বিভিন্ন থানায় প্রায় ডজন খানেক মামলা রয়েছে। প্রায় ১৫ বছর আগে ফারুক জীবিকার টানে পাবনা থেকে ঢাকায় আসেন। প্রথমে ছিলেন হেলপার এবং একসময় তিনি ড্রাইভিং শিখে চালক হয়ে যান। গত কয়েক বছর আগে আবুলের সঙ্গে ফারুকের পরিচয় হয়। দুজনের বন্ধুত্ব নিবিড় হয়ে উঠলে আবুল তার ‘প্রকত পেশা’র বিষয়টি ফারুককে জানালে ফারুক স্বেচ্ছায় আবুলের দলে যোগ দেন।
এ ব্যাপারে নিহত আবুলের ভাই আবুল কালাম জানান, আমার ভাই ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে আমরা কেউই তাকে পছন্দ করতাম না। জানা গেছে, উদ্ধারকৃত ৪টি লাশের মধ্যে একটি ছিল ঘটনাস্থলে পাওয়া মাইক্রোবাস চালক লুৎফর মোল্লার। মূলত এই লুৎফর মোল্লার গাড়ি দিয়েই ফারুক বিভিন্ন স্থানে গিয়ে ‘কাজ’ করতেন, এটা নিশ্চিত করেছেন ভুলতা এলাকার কয়েকজন পরিবহন শ্রমিক।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্রের দাবি, পুরো ঘটনাটি ডাকাতদলের অভ্যন্তরীন কোন্দলেরই পরিণতি যা এখন পুলিশের ওপর বর্তানোর চেষ্টা চলছে। ওই সূত্র আরও জানান, আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি নিহত ফারুক রূপগঞ্জ, সোনারগাঁসহ আশপাশের এলাকায় চিনির ট্রাক, রডের ট্রাক ডাকাতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তবে নিহতদের পরিবারের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নিহত জহিরুল, সবুজ নিজ এলাকায় বেকারির শ্রমিক ছিল। ফারুক তাদের নিয়ে এসে বিপথগামী করে।
এদিকেপ্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাসচালক ফারুকের স্ত্রী তাসলিমা বলেন, ফারুকের গ্রামের তিনজন—সবুজ, জহিরুল ও লিটন (সম্পর্কে ভাগনে) তাঁদের বাসায় ছিলেন। তাঁর স্বামীর সঙ্গে তাঁদের সবাইকে গত শুক্রবার তাঁর বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে রোববার সকালে মহাসড়কের পাশে লিটনের লাশ পাওয়া যায়নি। লিটনের অবস্থান কেউ জানে না। মহাসড়কের পাশ থেকে লুৎফর নামে যে মাইক্রোবাসচালকের লাশ পাওয়া যায়, তাঁকে চেনেন না তাসলিমা।

তাসলিমা বলেন, শুক্রবার বিকেলে একজন নারী তাঁর বাড়িতে ফারুকের কাছে এসেছিলেন। তখন ফারুক বলেন, ওই নারী তাঁর বন্ধুর স্ত্রী, বন্ধুকে পুলিশে ধরেছে, তাই পরামর্শ করতে এসেছেন। এর কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যার দিকে কয়েকজন লোক এসে ফারুককে ধরে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যান। এ সময় তাসলিমা চিৎকার করলে তাঁকে মারধর করা হয়।

তাসলিমা বলেন, শনিবার একজন ‘মহাজনের’ (বাসমালিক) মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, ফারুক ভুলতা ফাঁড়িতে আছেন। জানার পর রাতে বাসা থেকে ভাত-মাছ রান্না করে তিনি ফাঁড়িতে নিয়ে যান। কিন্তু প্রথমে পুলিশ তাঁকে ঢুকতে দেয়নি। অনেকক্ষণ অনুরোধ করার পর তিনি স্বামীকে খাবার দিতে পারেন, দেখাও হয়। ফারুক তখন তাঁকে বলেন, ‘ওরা খুব মারছে, আমি সব স্বীকার করছি।’ ফারুক কী স্বীকার করেছেন, জানতে চাইলে তাসলিমা বলেন, তিনি তা জানেন না।

ফারুকের বাবা জামালউদ্দীন পাবনায় ছিলেন, গতকাল সকালে নারায়ণগঞ্জে এসেছেন। তাঁর সঙ্গে নিহত সবুজের বাবা খায়রুল সরদার ও জহিরুলের শ্বশুর নজরুল ইসলামও পাবনা থেকে এসেছেন। হতদরিদ্র এ লোকগুলো গ্রাম থেকে চাঁদা তুলে ঢাকায় আসার খরচ জোগান বলে জানান।

জামালউদ্দীন বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় পুত্রবধূ তাসলিমা তাঁকে ফোন করে বিষয়টি জানান। এরপর গ্রামের এক ভাতিজার মাধ্যমে এক বাসমালিকের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। ওই বাসমালিক তাঁদের জানান, ফারুকদের ভুলতা ফাঁড়িতে রাখা হয়েছে। জামালউদ্দীন বলেন, ‘আম কলাম, দ্যাখেন তো, মহাজন, চালান দিবে না ছাড়বে। আমার কথা শুইনে মহাজন খোঁজ নিয়ে কলো, সব কটাক ফাঁড়িত রাখিছে পুলিশ।’ এরপর রোববার সকালে ওই বাসমালিক জামালকে জানিয়েছেন, চারজনের মধ্যে ফাঁড়িতে শুধু একজন আছেন। তিনজনকে ভোররাতে কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ফারুকের স্ত্রী তাসলিমা বলেন, তিনিও রোববার সকালে এসে ফাঁড়িতে কাউকে না পেয়ে সেখানেই চিৎকার করে কান্নাকাটি করেছেন। স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে বলেছেন। তখন পুলিশ তাঁকে গুলি করার হুমকি দিয়েছে।

এ ব্যাপারে ভুলতা ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক রফিকুল হক জানান, যাদের নাম বলা হচ্ছে এমন কাউকে এই ফাঁড়িতে আনাই হয়নি বা এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। আসামি রেজিস্টারেও এমন কারও নাম নেই।
তিনি বলেন, তাসলিমা যদি বলে থাকেন যে তার স্বামী সব স্বীকার করেছে, তাহলে আমারও প্রশ্ন কী স্বীকার করেছে, আর কে-ই বা তার স্বীকারোক্তি নিয়েছে। কোনো সাধারণ বাসচালক হলে তো এমন কথা বলার নয়। মূলত, তারা হয়তো কোনো আইনি জটিলতা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে এখন পুরো বিষয়টির দায় পুলিশের ওপর চাপানোর মতলবে মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুর রহমান বলেন, এ রকম কোনো ঘটনা ঘটার কথা নয়। যে বা যাঁরা এসব বলছেন, তাঁরা মিথ্যা বলছেন।

এ ঘটনায় পুলিশ হত্যা ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা করেছে। আড়াইহাজার থানার উপপরিদর্শক রফিকউল্লাহ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে এ মামলা করেন।